পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (তৃতীয় ভাগ).djvu/১৪

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


R খাজান আদায় বন্ধ হয় না । তবে তত আদায় হইয়া উঠে নাই--কেন না, মাত বসুমতী ধন প্রসব না করিলে ধন কেহ গড়িতে পারে না ! যাহা হউক, যাহা কিছু আদায় হইয়াছে, তাহ গাড়ী বোঝাই হইয়া সিপাহীর পাহারায় কলিকাতায় কোম্পানীর ধনাগারে যাইতেছিল ৷ আজিকার দিনে দুস্থ্যভীতি অতিশয় প্রবল, এজন্য পঞ্চাশ জন সশস্ত্র সিপাহী গাড়ীর অগ্রপশ্চাৎ শ্রেণীবদ্ধ হইয়া সঙ্গীন খাড়া করিয়া যাইতেছিল। তাহাদিগের অধ্যক্ষ এক জন গোরা । গোরা সৰ্ব্বপশ্চাৎ ঘোড়ায় চড়িয়া চলিয়াছিল । রৌদ্রের জন্য দিনে সিপাহীরা পথ চলে না, রাত্রে চলে । চলিতে চলিতে সেই খাজানার গাড়ী ও সৈন্যসামস্তে মহেঞ্জের গতিরোধ হইল । মহেন্দ্র সিপাহী ও গোরুর গাড়ী কর্তৃক পথ রুদ্ধ দেখিয়া, পাশ দিয়া দাড়াইলেন, তথাপি সিপাহীরা তাহার গা ঘোঁসিয়া যায়—দেখিয়া ং এ বিবাদের সময় নয় বিবেচনা করিয়া তিনি ; পথিপার্শ্বস্থ জঙ্গলের ধারে গিয়া দাড়াইলেন । iং তখন এক জন সিপাহী বলিল, “এহি একঠো ডাকু ভাগত হৈ ” মহেন্দ্রের হাতে বন্দক দেখিয়া এ ং বিশ্বাস তাহার দৃঢ় হইল। সে তাড়াইয়া গিয়া মহেন্দ্রের ; গলা ধরিল এবং “শালা-চোর"—বলিয়াই সহসা এক ঘুষ মারিল ও বন্দুক কাড়িয়া লইল । মহেন্দ্র রিক্তহস্তে কেবল ঘুঘাট ফিরাইয়া মারিলেন। মহেন্দ্রের একটু রাগ যে বেশী হইয়াছিল, তাহ বলা বাহুল । ঘুষাটি খাইয়া সিপাহী মহাশয় ঘুরিয়া অচেনত হইয়া রাস্তায় পড়িলেন । তখন তিন চারি জন সিপাহী আসিয়া মহেন্দ্রকে ধরিয়া জোরে টানিয়া সেনাপতি সাহেবের নিকট লইয়া গেল এবং সাহেবকে যলিল যে, এই ব্যক্তি :এক জন সিপাহীকে খুন করিয়াছে। সাহেব পাইপ খাইতেছিলেন, মদের ঝোকে একটুখানি বিঙ্গল ছিলেন, বলিলেন, “শালাকে পাকড়লেকে সাদি করে ” সিপাহীরা বুঝিতে পারিল না যে, বন্দুকধারী ডাকাতকে তাহারা কি প্রকারে বিবাহ করিবে ? কিন্তু নেশা ছুটলে সাহেবের মত ফিরিবে, বিবাহ করিতে হইবে না, বিবেচনায় তিন চারি জন সিপাহী :গোরুর গাড়ীর দড়ী দিয়া মহেন্দ্রকে হাতে পায়ে বাধিয়া গোরুর গাড়ীতে তুলিল। মহেন্দ্ৰ দেখিলেন, এত লোকের সঙ্গে জোর কর; বৃথা, জোর করিয়া করিয়াই বা কি হুইবে ? স্ত্রী-কন্যার শোকে মহেন্দ্র তখন কী স্তর, বাচিবার কোন ইচ্ছা ছিল না । সিপাহীরা মহেন্দ্রকে উত্তম করিয়া গাড়ীর চাকার সুজে বাধিল । পরে সিপাহীরা খাজানা লইয়া যেমন ধাইতেছিল, তেমনি মৃত্যুগম্ভীর পদে চলিল । ৰঙ্কিমচন্দ্রের প্রস্থাৰলী অষ্টম পরিচ্ছেদ প্রহ্মচারীর আজ্ঞা পাইয়। ভবাননা মুণ্ডু মৃং হরিনাম করিতে করিতে, যে চটিতে মহেন্দ্র বসিয়াছিলেন, সেই চটির দিকে চলিলেন । সেইখানেই মহেঞ্জের সন্ধান পাওয়া সম্ভব বিবেচনা করিলেন । সেই সময়ে ইংরেজের কৃত আধুনিক রাস্ত সকল ছিল না । নগর সকল হইতে কলিকাতায় আসিতে হইলে মুসলমান-সম্রাট নিৰ্ম্মিত অপূৰ্ব্ব বসু দিয়া আসিতে হইত। মহেন্দ্রও পদচিহ্ন হইতে নগর যাইতে দক্ষিণ হইতে উত্তরদিকে যাইতেছিলেন । এই জষ্ঠ পথে সিপাহীদিগের সঙ্গে তাহার সাক্ষাৎ হইয়াছিল। ভবানন্দ তালপাহাড় হইতে যে চটীর দিকে চলিলেন, সেগু দক্ষিণ হইতে উত্তর । যাইতে যাইতে কাজে কাজেক্ট অচিরাত ধনরক্ষাকারী সিপাহীদিগের সহিত সাক্ষাৎ হইল । তিনিও মহেন্দ্রের ন্যায় সিপাহীদিগকে পাশ দিলেন । একে সিপাহীদিগের সহজেই বিশ্বাস ছিল যে, এই চালান লুঠ করিবার জন্ত ডাকাইতেরা অবশ্ব চেষ্টা করিবে, তাতে আবার পথিমধ্যে এক জন ডাকইতকে গ্রেপ্তার করিয়াছে ; কাজে কাজেই ভবানন্দকে আবার রাত্রিকালে পাশ দিতে দেখিয়াই তাহাদিগের বিশ্বাস হইল যে, এও আর এক জন ডাকাত । অতএব সিপাহীরা তৎক্ষণাৎ তাহাকেও"ধূত করিল। ভবানন্দ মৃক্ত হাসিয়া বলিলেন, “কেন বাপু ?” সিপাহী বলিল, “তোম শালা ডাকু হে৷ ” ভবা । দেখিতে পাইতেছ, গেরুয়াবসন পরা ব্ৰহ্মচারা আমি, ডাকাত কি এই রকম ? সিপাহী । অনেক শালা ব্রহ্মচারী সন্ন্যাসী ডাকাতি করে । এই বলিয়া সিপাহী ভবানন্দকে গলাধাক্কা দিয়া টানিয়া আনিল । ভবানন্দের চক্ষু সে অন্ধকারে জ্বলিয়া উঠিল ; কিন্তু তিনি আর কিছু না বলিয়া অতি বিনীতভাবে বলিলেন, “প্রভু, কি করিতে হইবে, আজ্ঞা করুন।” সিপাহী ভবানন্দের বিনয়ে সস্তুষ্ট হইয়া বলিল, “লেও শালা, মাথে পর একঠে! মোট লেও ” এই বলিয়া সিপাহী ভবানন্দের মাথার উপর একটা তল্পী চাপাইয়। দিল । তখন আর এক জন সিপাহী তাহাকে বলিল, “না, পালাবে । আর এক শালাকে যেখানে বেঁধে রেখেছ, এই শালাকেও গাড়ীর উপর সেইখানে বেঁধে রাখ।” ভবানন্দের তখন আরও কৌতুহল হইল যে, কাহাকে বাধিয়া রাখিয়াছে, দেখিব । তখন ভবানন্দ মাথার তল্পী ফেলিয়া দিয়া ষে সিপাহী তল্পী মাথায় তুলিয়া দিয়াছিল, তাহার গালে ।