পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (তৃতীয় ভাগ).djvu/১৪১

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


চন্দ্রশেখর আসিয়াছিলাম, সে জন্য আপনার যাহা অভিরুচি হয়, করুন—আমি আপনার হাতে পড়িয়াছি। কেন আসিয়াছিলাম, তাহ জিজ্ঞাসার প্রয়োজন নাই—জিজ্ঞাসা করিলেও কোন উত্তর পাইবেন না। নবাব ক্রুদ্ধ না হইয়া হাসিলেন, বলিলেন, “জানিলাম, তুমি ভয়শূন্ত—সত্য কথা বলিতে পরিবে ?” ফ। ইংরেজ কখনও মিথ্যা বলে না । ন। বটে ? তবে দেখা যাউক । কে বলিয়াছিল যে, চন্দ্রশেখর উপস্থিত আছেন ? থাকেন, তবে র্তাহাকে আন । মহম্মদ ইবৃফান চন্দ্রশেখরকে আনিলেন । নবাব চন্দ্রশেখরকে দেখিয়া কহিলেন, “ইহাকে চেন ?” ফ। নাম শুনিয়াছি—চিনি না । ন। ভাল, বাদী কুলসম কোথায় ? কুলসমূও আসিল ; নবাব ফষ্টরকে কহিলেন, “এই বাদীকে চেন ?” ফ | ফ। চিনি । ন ! কে এ ? ফ । আপনার দাসী । ন। মহম্মদ তকিকে আন । তখন মহম্মদ ইবৃফান তকি পাকে বদ্ধাবস্থায় আনীত করিলেন । তকি খ এত দিন ইভস্ততঃ করিতেছিলেন, কোন পক্ষে যাই ; এই জন্ত শক্রপক্ষে আজিও মিলিতে পারেন নাই । কিন্তু তাহীকে অবিশ্বাসী জানিয়া নবাবের সেনাপতিগণ চক্ষে চক্ষে রাখিয়াছিলেন । আলি ইব্রাহিম খ অনায়াসে তাহকে বাধিয়। আনিয়াছিলেন । নবাব তকি খার প্রতি দৃষ্টিপাত না করিয়৷ বলিলেন, “কুলুসম, বল, তুমি মুঙ্গের হইতে কি প্রকারে কলিকাতায় গিয়াছিলে ?” কুলুসম আনুপূৰ্ব্বিক সকল বলিল । দলনী বেগমের বৃত্তাস্ত সকল বলিল । বলিয়া যোড়হস্তে সজলনয়নে উচ্চৈঃস্বরে বলিতে লাগিল—“জাহাপনা ! আমি এই আমদরবারে এই পাপিষ্ঠ স্ত্রীঘাতক মহম্মদ তকির নামে নালিশ করিতেছি, গ্রহণ করুন। সে আমার প্রভুপত্নীর নামে মিথ্যা অপবাদ দিয়া, আমার প্রভুকে মিথ্যা প্রবঞ্চনা করিয়া সংসারের স্ত্রীরত্নসার দলনী বেগমকে পিপীলিকাবৎ অকাতরে হত্যা করিয়াছে— জাহাপনা ! পিপীলিকাবৎ এই নরাধমকে অকাতরে झ७)ो कङ्गन ।' মহম্মদ তকি রুদ্ধকণ্ঠে বলিল, “মিথ্যা, কথা— তোমার সাক্ষী কে ?” কুল্‌সমৃ বিস্ফারিতলোচনে গর্জন করিয়া বলিল,— “আমার সাক্ষী ! উপরে চাহিয়া দেখ ৮—আমার সাক্ষী জগদীশ্বর ! আপনার বুকের উপর হাত দে —আমার সাক্ষী তুই । যদি আর কাহারও কথার প্রয়োজন থাকে, এই ফিরিঙ্গীকে জিজ্ঞাসা কর।” নবাব বলিলেন, “কেমন ফিরিঙ্গী, এই বাদী যাহা যাহা বলিতেছে, তাহ কি সত্য ? তুমিও ত আমিয়টের সঙ্গে ছিলে - ইংরেজ সত্য ভিন্ন বলে না ।” ফষ্টর যাহা জানিত, স্বরূপ বলিল। তাহাতে সকলেই বুঝিল, দলনী অনিন্দনীয়। তকি অধোবদন হইয়া রহিল । তখন চন্দ্রশেখর কিঞ্চিৎ অগ্রসর হইয়। বলিলেন, “ধৰ্ম্মাবতার ! বঁাদীর কথা যে সত্য, আমিও তাহার এক জন সাক্ষী । আমি সেই ব্রহ্মচারী ।” কুলুসম তখন চিনিল। বলিল, “ইনিই বটে।” তখন চন্দ্রশেখর বলিতে লাগিলেন, “রাজন্‌ ! যদি এই ফিরিঙ্গী সত্যবাদী হয়, তবে উহাকে আর দুই একটা কথা প্রশ্ন করুন ।” নবাব বুঝিলেন—বলিলেন, “তুমিই প্রশ্ন কর— দ্বিভাষীতে বুঝাইয়। দিবে ।” চন্দ্রশেখর জিজ্ঞাস করিলেন, “তুমি বলিয়াছ, চন্দ্রশেখর নাম শুনিয়াছ- -আমি সেই চন্দ্রশেখর। তুমি তাহার—” চন্দ্রশেখরের কথা সমাপ্ত হইতে ন হইতে ফষ্টর বলিল –“আপনি কষ্ট পাইবেন না। আমি স্বাধীন -- মরণ-ভয় করি না । এখানে কোন প্রশ্নের উত্তর দেওয়৷ ন দেওয়া আমার ইচ্ছা, আমি আপনার কোন প্রশ্নের উত্তর দিব না ।” নবাব অনুমতি করিলেন, আন " শৈবলিনী আনীত হইল। ফষ্টর প্রথমে শৈবলিনীকে চিনিতে পারিল না—শৈবলিনী রুগ্ন, শীর্ণl, মলিনী-জীর্ণ সঙ্কীর্ণবাসপরিহিত, অরঞ্জিত কুন্তলা —ধূলিধূসর। গায়ে খড়ি–মাথায় ধূলি-চুল আলু থালু–মুখে পাগলের হাসি—চক্ষে পাগলের জিজ্ঞাসা ব্যঞ্জক দৃষ্টি। ফষ্টর শিহরিল। নবাব জিজ্ঞাসা করিলেন, “ইহাকে চেন ?" ফ। চিনি । ন । এ কে ? ফ। শৈবলিনী—চন্দ্রশেখরের পত্নী । “তবে শৈবলিনীকে