পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (তৃতীয় ভাগ).djvu/১৪৪

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


ή ο বঙ্কিমচন্দ্রের স্থাবলী - - or প্রতাপ চিন্তা করিলেন ; বলিলেন,* বলিও, আশীবাদ করি, তুমি এবার সুখী হও ” এই বলিয়া প্রতাপ নীরবে অশ্রুবর্ষণ করিতে লাগিলেন । শৈ। আমি মুখী হইব না। তুমি থাকিতে .আমার মুখ নাই— প্র । সে কি শৈবলিনি ? শৈ। যত দিন তুমি এ পৃথিবীতে থাকিবে, আমার সঙ্গে আর সাক্ষাৎ করিও না । স্ত্রীলোকের চিত্ত অতি আসার, কত দিন বশে থাকিবে জানি না । এ জন্মে তুমি আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করিও না। প্রতাপ আর উত্তর করিলেন না । দ্রুতপদে অশ্বারোহণ করিয়া, অশ্বে কশাঘাত পূৰ্ব্বক সমরক্ষেত্ৰাভিমুখে ধাবমান হইলেন । র্তাহার সৈন্যগণ র্তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ ছুটিল । গমনকালে.চন্দ্রশেখর ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “কোথায় যাও ?” প্রতাপ বলিলেন, “যুদ্ধে।” চন্দ্রশেখর ব্যগ্রভাবে উচ্চৈঃস্বরে বলিতে লাগিলেন, *ধাইও না, যাইও না। ইংরেজের যুদ্ধে রক্ষা নাই ।” প্রতাপ বলিলেন, “ফষ্টর এখনও জীবিত আছে, তাহার বধে চলিলাম।" চন্দ্রশেখর দ্রুতপদে আসিয়া প্রতাপের অশ্বের বলুগ ধরিলেন। বলিলেন, “ফক্টরের বধে কাজ কি ভাই ? যে দুষ্ট, ভগবান তাহার দণ্ডবিধান করিবেন । তুমি আমি কি দণ্ডের কৰ্ত্ত ? যে অধম, সেই শত্রুর প্রতিহিংসা করে, যে উত্তম, সে শত্রুকে ক্ষম। করে ।” প্রতাপ বিস্মিত, পুলকিত হইলেন। এরূপ মহতা উক্তি তিনি কখনও লোকমুখে শ্রবণ নাই। অশ্ব হইতে অবতরণ করিয়৷ চন্দ্রশেখরের পদধূলি গ্রহণ করিলেন । বলিলেন, “অপনিষ্ট মনুষ্যমধ্যে ধন্ত । আমি ফষ্টরকে কিছু বলিব না ।” এই বলিয়া প্রতাপ পুনরপি অশ্বারোহণে যুদ্ধ ক্ষেত্রাভিমুখে চলিলেন। চন্দ্রশেখর বলিলেন, “প্রতাপ, তবে যুদ্ধক্ষেত্রে যাও কেন ?" প্রতাপ মুখ ফিরাইয়া অতি কোমল,অতি মধুর হাসি । হাসিয়া বলিলেন, “আমার প্রয়োজন আছে ” এই বলিয়া অশ্বে কশাঘাত করিয়া অতি দ্রুতবেগে চলিয়া গেলেন । সেই হাসি দেখিয়া রমানন্দ স্বামী উদ্বিগ্ন হইলেন । চন্দ্রশেখরকে বলিলেন, “তুমি বধূকে লইয়া গৃহে যাও। আমি গঙ্গাস্নানে যাইব । দুই এক দিন পরে সাক্ষাৎ হইবে।” - চন্দ্রশেখর বলিলেন, “আমি প্রতাপের জন্য অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হইতেছি ।” রমানন্দ স্বামী বলিলেন, “আমি র্তাহার তত্ত্ব লইয়া যাইতেছি।” এই বলিয়। রমানন্দ স্বামী চন্দ্রশেখর ও শৈবলিনীকে বিদায় করিয়া দিয়া যুদ্ধক্ষেত্রাভিমুখে চলিলেন। সেই ধূমময়, আহতের আর্তচীৎকারে ভীষণ যুদ্ধক্ষেত্রে অগ্নিবৃষ্টির মধ্যে প্রতাপকে ইতস্ততঃ অন্বেষণ করিতে লাগিলেন। দেখিলেন, কোথাও শবের উপর শব স্ত,পাকৃত হইয়াছে—কেহ মৃত, কেহ অৰ্দ্ধমৃত, কাহারও অঙ্গ ছিন্ন, কাহারও বক্ষ বিদ্ধ, কেহ “জল ! জল ।” করিয়া আৰ্ত্তনাদ করিতেছে—কেহ মাতা, ভ্রাতা, পিতা, বন্ধু প্রভৃতির নাম করিয়৷ ডাকিতেছে। রমানন্দ স্বামী সেই সকল শবের মধ্যে প্রতাপের অনুসন্ধান করিলেন, পাইলেন না। দেখিলেন, কত অশ্বারোহী রুধিরাক্তকলেবরে আহত অশ্বের পৃষ্ঠে আরোহণ করিয়৷ অস্ত্রশস্ত্র ফেলিয়া পলাইতেছে, অশ্বপদে কত হুততাগ্য আহত যোদ্ধৃবর্গ দলিত হইয়া বিনষ্ট হইতেছে । তাহাদিগের মধ্যে প্রতাপের সন্ধান করিলেন, পাইলেন না। দেখিলেন, কত পদাতিক রিক্তহস্তে, উৰ্দ্ধশ্বাসে, রক্তপ্লাবিত হইয়া পলাইতেছে, তাহাদিগের মধ্যে প্রতাপের অমুসন্ধান করিলেন, পাইলেন না। শ্রাস্ত হইয়া রমানন্দ স্বামী এক বৃক্ষমূলে উপবেশন করিলেন । সেইখান দিয়া এক জন সিপাহী পলাইতেছিল । রমানন্দ স্বামী তাহাকে জিজ্ঞাস করিলেন, “তোমরা সকলেই পলাইতেছ - তবে যুদ্ধ করিল কে ?” সিপাহী বলিল, “কেহ নহে। কেবল এক হিন্দু বড় যুদ্ধ করিয়াছে ।” স্বামী জিজ্ঞাসা করিলেন, “সে কোথা ?” সিপাহী বলিল, “গড়ের সম্মুখে দেখুন " এই বলিয়। সিপাহী পলাইল ; রমানন্দ স্বামী গড়ের দিকে গেলেন । দেখিলেন, যুদ্ধ নাই, কয়েক জন ইংরেজ ও হিন্দুর মৃতদেহ একত্র স্ত,পীকৃত হইয় পড়িয়া রহিয়াছে। স্বামী তাহীর মধ্যে প্রতাপের অনুসন্ধান করিতে লাগিলেন। পতিত হিন্দুদিগের মধ্যে কেহ গভীর কাতরোক্তি করিল। রমানন্দ স্বামী তাহাকে টানিয়া বাহির করিলেন, দেখিলেন, সেই প্রতাপ ! আহত মৃতপ্রায়, এখনও জীবিত । রমানন্দ স্বামী জল আনিয়া তাহার মুখে দিলেন। প্রতাপ তাহাকে চিনিয়া প্রণামের জন্য হস্তোত্তোলন করিতে উদ্যোগ করিলেন, কিন্তু পারিলেন না। স্বামী বলিলেন, “আমি আমনই আশীৰ্ব্বাদ করিতেছি, আরোগ্য লাভ কর।”