পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (তৃতীয় ভাগ).djvu/১৪৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


চন্দ্রশেখর প্রতাপ কষ্টে বলিলেন, “আরোগ্য ? আরোগ্যের আর বড় বিলম্ব নাই। আপনার পদরেণু অামার মাথায় দিন ।” রমাননা স্বামী জিজ্ঞাসা করিলেন,—“আমরা নিষেধ করিয়াছিলাম, কেন এ দুর্জয় রণে আসিলে ? শৈবলিনীর কথায় কি এরূপ করিয়াছ ?” প্রতাপ বলিল, “আপনি কেন এরূপ আজ্ঞা করিতেছেন ?” স্বামী বলিলেন, “যখন তুমি শৈবলিনীর সঙ্গে কথা কহিতেছিলে, তখন তাহীর আকারেঙ্গিত দেখিয়৷ বোধ হইয়াছিল যে, সে আর উন্মাদগ্ৰস্ত নহে এবং বোধ হয়, তোমাকে একেবারে বিস্তৃত হয় নাই ।” প্রতাপ বলিলেন, “শৈবলিনী বলিয়াছিল যে, এ পৃথিবীতে আমার সঙ্গে আর সাক্ষাৎ না হয় । আমি বুঝিলাম, আমি জীবিত থাকিতে শৈবলিনী ব| চন্দ্রশেখরের সুখের সম্ভাবনা নাই । যাহার। আমার পরম প্রীতির পাত্র, যাহার। আমার পরমোপকারী, তাহদিগের সুখের কণ্টকস্বরূপ এ জীবন আমার রাখা অকৰ্ত্তব্য বিবেচনা করিলাম । তাই আপনাদিগের নিষেধ সত্ত্বেও এ সমরক্ষেত্রে প্রাণত্যাগ করিতে আসিয়াছিলাম। আমি থাকিলে শৈবলিনীর চিত্ত কখনও ন। কখনও বিচলিত হইবার সম্ভাবনা ৷ অতএব আমি চলিলাম।” রমানন্দ স্বামীর চক্ষে জল আসিল । আর কেহ কখনও রমানন্দ স্বামীর চক্ষে জল দেখে নাই । তিনি বলিলেন, “এ সংসারে তুমিই যথার্থ পরহিতব্ৰতধারী . আমরা ভণ্ডমাত্র । তুমি পরলোকে অনন্ত অক্ষয় স্বৰ্গভোগ করিবে, সন্দেহ নাই ।” ক্ষণেক নীরব থাকিয়া, রমানন্দ স্বামী বলিতে লাগিলেন, “শুন বৎস । আমি তোমার অস্তকরণ বুঝিয়াছি । ব্ৰহ্মাণ্ড জয় তোমার এই ইন্দ্রিয়জয়ের তুল্য হইতে পারে না—তুমি শৈবলিনীকে ভালবাসিতে ?” স্বপ্তসিংহ যেন জাগিয়া উঠিল। সেই শবাকার প্রতাপ বলিষ্ঠ, চঞ্চল, উন্মত্তবৎ হুহুঙ্কার করিয়া উঠিল । বলিল—“কি বুঝিবে, তুমি সন্ন্যাসী ! এ জগতে মনুষ্য কে আছে ষে, আমার এ ভালবাসা বুঝিবে ? কে 이 বুঝিবে, আজি এই ষোড়শ বৎসর আমি শৈবলিনীকে কত ভালবাসিয়াছি ? পাপচিত্তে আমি তাহার প্রতি অনুরক্ত নহি –আমার ভালবাসার নাম—জীবনবিস" র্জনের আকাঙ্ক্ষ। শিরে শিরে, শোণিতে শোণিতে, অস্থিতে অস্থিতে, আমার এই অনুরাগ অহোরাত্র বিচরণ করিয়াছে । কখনও মানুষে তাহা জানিতে পারে নাই—মানুষে তাহ জানিতে পারিত না—এই " মৃত্যুকালে আপনি কথা তুলিলেন কেন ? এ জন্মে এ অনুরাগে মঙ্গল নাই বলিয়া এ দেহ পরিত্যাগ করিলাম। আমার মন কলুষিত হইয়াছে—কি জানি, শৈবলিনীর হৃদয়ে আবার কি হইবে ? আমার মৃত্যু ভিন্ন ইহার উপায় নাই—এই জন্য মরিলাম । আপনি এই গুপ্ত তত্ত্ব শুনিলেন—আপনি জ্ঞানী, আপনি শাস্ত্রদর্শী, আপনি বলুন, আমার পাপের কি প্রায়শ্চিত্ত ? আমি কি জগদীশ্বরের কাছে দোষী ? যদি দোষ হইয়া থাকে, এ প্রায়শ্চিত্তে কি তাহার মোচন হইবে না ?” রমানন্দ স্বামী বলিলেন, “তাহা জানি না। মানুষের জ্ঞান এখানে অসমর্থ ; শাস্ত্র এখানে মূক । তুমি যে লোকে যাইতেছ,সেই লোকেশ্বর ভিন্ন একথার কেহ উত্তর দিতে পরিবেন না । তবে ইহাই বলিতে পারি, ইন্দ্রিয়জয়ে যদি পুণ্য থাকে, তবে অনন্ত স্বর্গ তোমারই। যদি চিত্তসংঘমে পুণ্য থাকে, তবে দেবতারাও তোমার তুল্য পুণ্যবান নহেন । যদি পরোপকারে স্বর্গ থাকে, তবে দধীচির অপেক্ষাও তুমি স্বর্গের অধিকারী। প্রার্থন করি, জন্মাস্তরে যেন তোমার মত ইন্দ্রিয়জয়ী হই ।” রমানন্দ স্বামী নীরব হইলেন । ধীরে ধীরে প্রতাপের প্রাণ বিমুক্ত হইল। তৃণশয্যায় অনিন্দ্য জ্যোতিঃ স্বর্ণতরু পড়িয়া রহিল । তবে যাও প্রতাপ, অনস্তধামে ! যাও, যেখানে ইন্দ্রিয়জয়ে কষ্ট নাই, রূপে মোহ নাই, প্রণয়ে পাপ নাই, সেইখানে যাও ! যেখানে রূপ অনন্ত, প্রণয় অনন্ত, স্বখ অনন্ত, সুখে অনন্ত পুণ্য, সেইখানে যাও ! যেখানে পরের দুঃখ পরে জানে, পরের ধৰ্ম্ম পরে রাখে, পরের জয় পরে গায়, পরের জন্ত পরকে মরিতে হয় ন, সেই মহৈশ্বৰ্য্যময় লোকে ষাও ! লক্ষ শৈবলিনী পদপ্রাস্তে পাইলেও ভালবাসিতে চাহিবে না । আশব্লাঙ্ক