পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (তৃতীয় ভাগ).djvu/১৫১

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


কপালকুণ্ডল৷ & উপক্রম দেখিয়া প্রাচীন, প্রাগুক্ত যুবাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, “বাপু নবকুমার ! তুমি ইহার উপাস না করিলে আমরা এতগুলি লোক মারা যাই ।” নবকুমার কিঞ্চিৎকাল চিন্তা করিয়া কহিলেন, “আচ্ছ, যাইব ; কুড়ালি দাও, আর দা লইয়া, এক জন আমার সঙ্গে আইস ।” কেহই নবকুমারের সহিত যাইতে চাহিল না । “খাবার সময় বুঝা যাবে” এই বলিয়। নবকুমার কোমর বাধিয়। একাকী কুঠারহস্তে কাষ্ঠাহরণে চলিলেন । তীরোপরি আরোহণ করিয়। নবকুমার দেখিলেন যে, যতদুর দৃষ্টি চলে, ততদুর মধ্যে কোথাও বসতির লক্ষণ কিছুই নাই । কেবল বনমাত্র । কিন্তু সে বন, দীর্ঘ বৃক্ষাবলীশোভি ত বা নিবিড় বন নহে ;–কেবল স্থানে স্থানে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উদ্ভিদ মণ্ডলাকারে কোন কোন ভূমিখণ্ড ব্যাপিয়াছে। নবকুমার তন্মধ্যে আহরণযোগ্য কাষ্ঠ দেখিতে পাইলেন না ; সুতরাং উপযুক্ত বৃক্ষের অমুসন্ধানে নদীতট হইতে অধিক দূর গমন করিতে হইল । পরিশেষে ছেদনযোগ্য একটি বৃক্ষ পাইয় তাহা হইতে প্রয়োজনীয় কাষ্ঠ সমাহরণ করি লেন । কাষ্ঠ বহন করিয়া অনা অার এক বিষম কঠিন ব্যাপার বোধ হইল। নবকুমার দরিদ্রের সন্তান ছিলেন না, এ সকল কৰ্ম্মে অভ্যাস ছিল না ; সম্যক বিবেচন না করিয়৷ কাষ্ঠ আহরণে আসিয়াছিলেন ; কিন্তু এক্ষণে কাষ্ঠভার-বহন বড় ক্লেশকর হইল । যাহাই হউক, যে কৰ্ম্মে প্রবৃত্ত হইয়াছেন, তাহাতে অল্প ক্ষস্তি হওয়া নবকুমারের স্বভাব ছিল না । এ জন্য তিনি কোনমতে কাষ্ঠভার বহিয়৷ আনিতে লাগিলেন । কিয়দর বহেন, পরে ক্ষণেক বসিয়া বিশ্রাম করেন, আবার বছেন ; এইরূপে আসিতে লাগিলেন । এই হেতুবশতঃ নবকুমারের প্রত্যাগমনে বিলম্ব হইতে লাগিল । এদিকে সমভিব্যাহারিগণ র্তাহার বিলম্ব দেখিয়া উদ্বিগ্ন হইতে লাগিল ; তাহাদিগের এইরূপ আশঙ্ক হইল যে, নরকুমারকে ব্যান্ত্রে হত্য করিয়াছে । সম্ভাব্য কাল অতীত হইলে এইরূপষ্ট তাহাদিগের হৃদয়ে স্থিরসিদ্ধান্ত হইল। অথচ কাহারও এমন সাহস হইল না ষে, তীরে উঠিয়া কিয়দর অগ্র সর হইয়া তাহার অনুসন্ধান করে । নৌকারোহিগণ এইরূপ কল্পনা করিতেছিল ; ইত্যবসরে জলরাশিমধ্যে ভৈরব কল্লোল উত্থিত হইল । নাবিকেরা বুঝিল যে,—জোয়ার আসিতেছে। নাবিকেরা বিশেষ জানিত যে, এ সকল স্থানে জলোচ্ছ্বাসকালে ভটদেশে এরূপ প্রচণ্ড তরঙ্গাভিঘাত হয় যে, তখন নৌকাদি তীরবর্তী থাকিলে, তাহ খণ্ড খণ্ড হইয়া যায়। এ জন্য তাহার। অতিবাস্তে নৌকার বন্ধন মোচন করিয়া নদীমধ্যবর্তী হইতে লাগিল । নৌকা মুক্ত হইতে না হইতেই সন্মুখস্থ সৈকতভূমি জলপ্লুত হইয়৷ গেল, ষাত্রিগণ কেবল ত্রস্তে নৌকায় উঠিতে অবকাশ পাইয়াছিল, তণ্ডুলাদি ধাহ! সাই চরে স্থিত হইয়াছিল, তৎসমুদায় ভাসিয়া গেল। দূৰ্ভাগ্যবশতঃ নবিকেরা সুনিপুণ নহে ; নৌক সামলাইতে পারিল না ; প্রবল জলপ্রবাহবেগে তরণী রসুলপুর নদীর মধ্যে লইয়৷ চলিল। এক জন আরোহী কহিল, “নবকুমার রহিল যে ?” এক জন নাবিক কহিল, “আঃ, তোর নবকুমার কি আছে ? তাকে শিয়ালে খাইয়াছে.।” জলবেগে নেীক। রসুলপুরের নদীর মধ্যে লইয়। যাইতেছে, প্রত্যাগমন করিতে বিস্তর ক্লেশ হইবে, এই জষ্ঠ নাবিকের প্রাণপণে তাহার বাহিরে আসিতে চেষ্ট৷ করিতে লাগিল । এমন কি, সেই মাঘমাসে তাহাদিগের ললাটে স্বেদশ্ৰুতি হইতে লাগিল । এইরূপ পরিশ্রম দ্বার রসুলপুর-নদীর ভিতর হইতে বাহিরে আসিতে লাগিল বটে, কিন্তু নৌকা যেমন বাহিরে আসিল, অমনি তথাকার প্রবলতর স্রোতে উত্তরমুখী হইয়। তীরবৎ বেগে চলিল, মাবিকেরা তাহার তিলাৰ্দ্ধমাত্র ংযম করিতে পারিল না । নৌকা আর ফিরিল না । যখন জলবেগ এমত মনীভূত হইয়। আসিল যে, নৌকার গতি সংযত কর বাইতে পারে, তখন যাত্রীর। রস্থলপুরের মোহান অতিক্রম করিয়৷ অনেক দূরে আসিয়াছিলেন । এখন নবকুমারের জঙ্গ প্রত্যাবৰ্ত্তন করা যাইবে কি না, এ বিষয়ের মীমাংসা আবখ্যক হইল। এই স্থানে বলা আবশ্বক যে, নবকুমারের সহযাত্রীরা তাহার প্রতিবেশী মাত্র, কেহই আত্মবন্ধু নহে । তাহারা বিবেচনা করিয়া দেখিলেন যে, তথা হইতে প্রতিবৰ্ত্তন করা তার এক ভাটার কৰ্ম্ম । পরে রাত্ৰি আগত হইবে, আর রাত্রে নৌকা চালনা হইতে পারিবে না, অতএত পরদিনের জোয়ারের প্রতীক্ষা করিতে হইবে । এ কাল পর্য্যস্ত সকলকে অনাহারে থাকিতে হইবে । দুই দিন নিরাহারে সকলের প্রাণ ওষ্ঠাগত হইবে । বিশেষ নাবিকের প্রতিগমন করিতে অসন্মত ; তাহায়া কথার বাধ্য নহে । তাহারা বলিতেছে যে, নবকুমারকে ব্যান্ত্রে হত্যা করিয়াছে। তাহাই সম্ভব । তবে এত ক্লেশ-স্বীকার কি জন্ত ? এইরূপ বিবেচনা করিয়৷ যাত্রীরা নবকুমার ব্যতীত স্বদেশে গমনই উচিত বিবেচনা করিলেন। নবকুমার সেই ভীষণ সমুদ্রতীরে বনবাসে বিসর্জিত হইলেন ।