পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (তৃতীয় ভাগ).djvu/১৫৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


... কপালকুণ্ডল বিদীর্ণ হুইতেছিল। দুরন্ত শীতনিবারণজন্ত আশ্রয় নাই, গাত্রবস্ত্র পর্য্যন্ত নাই। এই তুষার শীতল বায়ু সঞ্চারিত নদীতীরে, হিমবর্ষী আকাশতলে, নিরাশ্রয়ে নিরাবরণে শয়ন করিয়া থাকিতে হুইবে । হয় ত, রাত্রিমধ্যে ব্যাঘ্র ভল্লুকে প্রাণনাশ কৱিবে । অদ্য না করে, কল্য করিবে। প্রাণনাশই নিশ্চিত । মনের চাঞ্চল্যহেতু নবকুমার একস্থানে অধিকক্ষণ বসিয়া থাকিতে পারিলেন না । তীর ত্যাগ করিয়া উপরে উঠিলেন ; ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিতে লাগিলেন। কমে অন্ধকার হইল। শিশিরাকাশে নক্ষত্রমণ্ডলী নীরবে ফুটিতে লাগিল,—যেমন নবকুমারের স্বদেশে ফুটিতে থাকে, তেমনি ফুটিতে লাগিল । অন্ধকারে সৰ্ব্বত্র জনহীন ;–আকাশ, প্রাস্তর, সমুদ্র, সৰ্ব্বত্র নীরব, কেবল অবিরল কল্লোলিত সমুদ্রগর্জন, আর কদাচিৎ বন্যপশুর রব। তথাপি নবকুমার সেই অন্ধকারে, শীতবৰ্ষী আকাশতলে বলুকাস্তপের চতুষ্পাশ্বে ভ্রমণ কুরিতে লাগিলেন। কখন উপত্যকায়, কখন অধিওঁ্যকায়, কখন স্তপতলে, কখন স্ত পশিখরে ভ্রমণ করিতে লাগিলেন । চলিতে চলিতে প্রতিপদে হিংস্র পশু কর্তৃক আক্রান্ত হইবার সম্ভাবনা, কিন্তু এক স্থানে বসিয়া থাকিলেও সেই আশঙ্ক । ভ্রমণ করিতে করিতে নবকুমারের শ্রম জন্মিল । সমস্ত দিন অনাহার ; এ জন্য অধিক অবসন্ন হইলেন । এক স্থানে বালিয়াড়ির পাশ্বে পৃষ্ঠরক্ষা করিয়া বসিলেন । গৃহের সুখতপ্ত শয্যা মনে পড়িল । যখন শারীরিক ও মানসিক ক্লেশের অবসাদে চিস্ত উপস্থিত হয়, তখন কখন কখন নিদ্রা আসিয়া সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত হয় । নবকুমার চিস্ত করিতে করিতে তন্দ্রাভিভূত হইলেন । বোধ হয়, যদি এরূপ নিয়ম ন! থাকিত, তবে সাংসারিক ক্লেশের অপ্রতিহত বেগ সকলে সকল সময়ে সহ্য করিতে পারিত না । চতুর্থ পরিচ্ছেদ স্তুপ-শিখরে “—সবিস্ময়ে দেখিল। অদূরে ভীষণদর্শন মূৰ্ত্তি ।” —মেঘনাদবধ । যখন নবকুমারের নিদ্রাভঙ্গ হইল, তখন রজনী গভীরা। এখনও যে র্তাহাকে ব্যান্ত্রে হত্যা করে নাই, ইছা তাহার আশ্চৰ্য্য বোধ হইল । ইতস্ততঃ নিরীক্ষণ করিয়া দেখিতে লাগিলেন, ব্যাঘ্র আসিতেছে কি না । অকস্মাৎ সম্মুখে বহুদূরে, একটা আলোক দেখিতে পাইলেন। পাছে ভ্ৰম জন্মিয় থাকে, এ জন্ত নবকুমার মনোভিনিবেশ পূৰ্ব্বক তৎপ্রতি দৃষ্টি করিতে লাগিলেন । আলোক-পরিধি ক্রমে বৰ্দ্ধিতায়তন এবং উজ্জ্বলতর হইতে লাগিল -আগ্নেয় আলোক বলিয়া প্রতীতি জন্মাইল। প্রতীতিমাত্র নবকুমারের জীবনআশা পুনরুদ্দীপ্ত হইল। মনুষ্যসমাগম ব্যতীত এ আলোকের উৎপত্তি সম্ভবে না। নবকুমার গাত্রোথান করিলেন ; যথায় আলোক, সেই দিকে ধাবিত হইলেন। একবার মনে ভাবিলেন, “এ আলোক ভৌতিক ?—হইতেও পারে ; কিন্তু শঙ্কায় নিরস্ত থাকিলেই কোন জীবনরক্ষা হয় ?" এই ভাবিয়া নিৰ্ভীকচিত্তে আলোক লক্ষ্য করিয়া চলিলেন। বৃক্ষ, লতা, বালুকাস্তুপ পদে পদে র্তাহার গতিরোধ করিতে লাগিল। বৃক্ষতলা দলিত করিয়া, বালুক; স্কুপ লক্তিঘত করিয়া নবকুমার চলিলেন । আলোকের নিকটবৰ্ত্তী হইয়। দেখিলেন যে, এক অত্যুচ্চ বালুকাস্তুপের শিরোভাগে অগ্নি জলিতেছে ; তৎপ্রভায় শিখরাসীন মমুন্যমূৰ্ত্তি আকাশপটস্থ চিত্রের ন্যায় দেখা যাইতেছে। নবকুমার শিখরাসীন মনুষ্যের সমীপবৰ্ত্তী হইবেন, স্থির-সঙ্কল্প করিয়া অশিথিলীভূতবেগে চলিলেন । পরিশেষে স্তুপারোহণ করিতে লাগিলেন। তখন কিঞ্চিৎ শঙ্কা হইতে লাগিল—তথাপি আকম্পিতপদে স্তুপারোহণ করিতে লাগিলেন । আসীন ব্যক্তির সন্মুখবৰ্ত্তী হইয়া যাহা যাহা দেখিলেন, তাহাতে র্তাহার রোমাঞ্চ হইল। তিষ্ঠিবেন কি প্রত্যাবর্তন করিবেন, তাহা স্থির করিতে পারিলেন ন! | শিখরাসীন মনুষ্য নয়ন মুদিত করিয়া ধ্যান করিতেছিল—নবকুমারকে প্রথমে দেখিতে পাইল না । নবকুমার দেখিলেন, তাহার বয়ঃক্রম প্রায় পঞ্চাশত বৎসর হইবে । পরিধানে কোন কাপাস-বস্ত্র আছে কি না, তাহা লক্ষ্য হইল না ; কটিদেশ হইতে জায় পৰ্য্যন্ত শাৰ্দ্দলচৰ্ম্মে আবৃত। গলদেশে রুদ্রাক্ষ মালা ; আয়ত মুখমণ্ডল শ্মশ্রীজটাপরিবেষ্টিত। সম্মুখে কাঠে অগ্নি জলিতেছিল—সেই অগ্নির দীপ্তি লক্ষ্য করিয়া নবকুমার সে স্থলে আসিতে পারিয়াছিলেন । নবকুমার একটা বিকট দুর্গন্ধ পাইতে লাগিলেন ; ইহার আসন প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া তাহার কারণ অনুভূত করিতে পারিলেন । জটাধারী এক ছিল্লশীর্ষ গলিত শবের উপর বসিয়া আছেন । আরও সভয়ে দেখিলেন যে, সম্মুখে নরকপাল রহিয়াছে ;