পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (তৃতীয় ভাগ).djvu/১৬

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


Ꮌ8 বুদ্ধস্থান হইতে সরিয়া গিয়া দাড়াইলেন । কেন না, দসু্যদের সহায়তা করিলে তাহাদিগের প্রাচারের ভাগী হইতে হইবে । তখন তিনি তরবারি ফেলিয়া দিয়া ধীরে ধীরে সে স্থান ত্যাগ করিয়া যাইতেছিলেন, এমন সময়ে ভবানন্দ আসিয়া তাহার নিকটে দাড়াইল । মহেন্দ্র জিজ্ঞাসা করিলেন, “মহাশয়, আপনি কে ?” ভবানন্দ বলিলেন, “তোমার তাতে প্রয়োজন কি ?” মহেন্দ্র । আমার কিছু প্রয়োজন আছে । আজ আপনার দ্বার। বিশেষ উপকৃত হইয়াছি । ভব। সে বোধ যে তোমার আছে, এমন বুঝি লাম না—অস্ত্র হাতে করিম তফাৎ রহিলে—জমাদারের ছেলে দুধ বির শ্রদ্ধ করিতে মজবত –কাজের বেলা হনুমান । ভবানন্দের কথা ফুরাইতে না কুরাইতে মহেন্দ্র ঘৃণার সহিত বললেন, “এ যে কুকাজ-ডাকাতি ।" ভবানন্দ বলিলেন, “ইউক ডাকাতি, আমর! তোমার কিছু উপকার করিয়াছি । আরও কিছু উপকার করিবার ইচ্ছ। রাখি ” মহে । তোমরা আমার কিছু উপকার করিয়াছ বটে, কিন্তু আর কি উপকার করিবে ? আর ডাকাতের কাছে এত উপকৃত হওয়ার চেয়ে আমার অনুপকৃত থাকাই ভাল । ভবা । উপকার গ্রহণ কর না কর, তোমারই ইচ্ছ। যদি ইচ্ছা হয়, আমার সঙ্গে আইস তোমার স্ত্রীকৃষ্ঠার সঙ্গে সাক্ষাৎ করাইব । মহেন্দ্র ফিরিয়| দাড়াইলেন । কি ?” ভবানন্দ সে কথার উত্তর না করিয়৷ চলিলেন । অগত্যা মহেন্দ্র সঙ্গে সঙ্গে চলিলেন —মনে মনে ভাবিতে লাগিলেন, এরা কি রকম দস্থ ? বলিলেন, “স দশম পরিচ্ছেদ সেই জ্যোৎস্নামী রজনীতে দুই জনে নীরবে প্রাস্তুর পার হইয়া চলিলেন । মহেন্দ্র নীরব, শোককাতর, গৰ্ব্বিত, কিছু কৌতুহলী । ভবানন্দ সহসা ভিন্ন মুৰ্ত্তি ধারণ করিলেন । সে স্থির মূৰ্ত্তি ধীরপ্রকৃতি সন্ন্যাসী আর নাই ; সেই রণনিপুণ বীরমূৰ্ত্তি—সৈনাধ্যক্ষের মুগুঘাতীর মূৰ্ত্তি আর নাই । এখনই যে গৰ্ব্বিতভাবে মহেন্দ্রকে তিরস্কার করিতেছিলেন, সে মূৰ্ত্তি আর নাই। যেন জ্যোৎস্নাময়ী বঙ্কিমচন্দ্রের গ্রন্থাবলী শান্তিশালিনী, পৃথিবীর প্রান্তর কানন নগনদীময় শোভা দেখিয় তাহার চিত্তের বিশেষ ফুৰ্ত্তি হইল। সমুদ্র যেন চন্দ্রোদয়ে হাসিল । ভবানন্দ হাস্তমুখ, বাস্ময়, প্রিয়সম্ভাষী হইলেন । কথা-বাৰ্ত্তার জন্য বড় ব্যগ্ৰ । ভবানন্দ কথোপকথনে অনেক উদ্যম করিলেন, কিন্তু মহেন্দ্র কথ। কহিলেন না । তখন ভবানন্দ নিরুপায় হইয় আপন মনে গীত আরম্ভ করিলেন— “বন্দে মাতরম্ * সুজলাং সুফলাং মলয়জশীতলাম্ শস্তহামলাং মাতরম্ " | মহেন্দ্র গীত শুনিয়া কিছু বিস্থিত হইলেন, কিছু বুঝিতে পারিলেন ন—সুজলা, সুফল, মলয়জশীতলা, শস্যশু্যামল, মাত কে ? জিজ্ঞাস করিলেন, “মাতা কে?" উত্তর ন৷ করিয়া ভবানন্দ গায়িতে লাগিলেন-- “শুভ্ৰ-জোৎস্না-পুলকিত-যামিনীম্ ফুল্লকুসুমিত-দ্ৰুমদলশোভিনীম্ সুহাসিনীং সুমধুরভাষিণীম্ সুখদাং বরদাং মাতরম্ ॥" মহেন্দ্র বলিলেন, “এ ত দেশ, এ ত ম| নয়।" ভবানন্দ বলিলেন, “আমর! অঙ্গ মা মানি না--- জননী জন্ম ভূমিশচ স্বর্গাদপি গরায়সী । আমরা বলি, জন্মভূমিষ্ট জননী, আমাদের ম| নাই, বাপ নাই, ভাই নষ্ট, স্ট্রী নষ্ট, পুল্ল নাই, ঘর নাই, বাড়ী নাই, আমাদের আছে কেবল সেই সুজলা, সুফল, মলয়জসমীরণ-শীতল, শস্ত্যখ্যামল! —” তখন বুঝিয়। মহেন্দ্র বলিলেন, “তবে আবার গাও " ভবানন্দ আবার গায়িলেন,-- “বন্দে মাতরম্ । সুজলাং সুফলাং মলয়জশীতলাম্ শস্ত্যামলাং মাতরম্ । শুভ্ৰ-জ্যোৎস্না-পুলকিতযামিনীম্ ফুল্লকুসুমিত-দ্ৰুমদলশোভিনীম্, সুহাসিনীং সুমধুরভাষিণীম্, মুখদাং বরদাং মাতরম্ ॥ সপ্তকোটিকণ্ঠকলকলনিনাদকরালে, দ্বিসপ্তকোটিভুজৈধৃতখরকরবালে, ” অবলা কেন মা এত বলে । বহুবলধারিণীং নমামি তারিণীম্ রিপুদলবারিণীং মাতরম্ ॥ • মল্লার—কাওয়ালী তাল যথা—বঙ্গে মাতরম্ ইত্যাদি ।