পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (তৃতীয় ভাগ).djvu/১৬৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


কপালকুণ্ডল৷ সামগ্রীই লইয়াছিল—নিকটে যাহা ছিল, তদ্ব্যতীত কিছুই পায় নাই । নবকুমার দুই একখানি গহন কপালকুণ্ডলার অঙ্গে রাখিয়া অধিকাংশ কোঁটায় তুলিয়। রাখিলেন । পরদিন প্রভাতে মতিবিবি বৰ্দ্ধমানাভিমুখে, নবকুমার সপত্নীক সপ্তগ্রামাভিমুখে যাত্রা করিলেন । নবকুমার কপালকুণ্ডলাকে শিবিকাতে তুলিয়া দিয়া তাহার সঙ্গে গহনীর কোঁটা দিলেন । বাহকেরা সহজেই নবকুমারকে পশ্চাৎ করিয়া চলিল। কপালকুণ্ডল শিবিকার দ্বার খুলিয়া চারিদিক্‌ দেখিতে দেখিতে যাইতেছিলেন ; এক জন ভিক্ষুক তাহাকে দেখিতে পাইয়া, ভিক্ষা চাহিতে চাহিতে পান্ধীর সঙ্গে সঙ্গে চলিল । কপালকুণ্ডল কহিলেন, “আমার ত কিছুই নাই, তোমাকে কি দিব ?” ভিক্ষুক কপালকুণ্ডলার অঙ্গে যে দুই একখান। অলঙ্কার ছিল, তৎপ্রতি অঙ্গুলিনির্দেশ করিয়া কহিল, “সে কি মা ! তোমার গায়ে হারা-মুক্তা—তোমার কিছুই নাই ?” কপালকুণ্ডল জিজ্ঞাসা করিলেন, “গহন পাইলে তুমি সস্তুষ্ট হও ?” ভিক্ষুক কিছু বিস্মিত হইল । ভিক্ষুকের আশা অপরিমিত । ক্ষণমাত্র পরে কহিল, “হই বৈ কি " কপালকুণ্ডল। অকপটহৃদয়ে কেীট। সমেত সকল গহন গুলি ভিক্ষুকের হস্তে দিলেন । অঙ্গের অলঙ্কার গুলিও খুলিয়া দিলেন । ভিক্ষুক ক্ষণেক বিজ্ঞবল ছইয়। রহিল । দাস-দাসী কিছুমাত্র জানিতে পারিল না । ভিক্ষুকের বিহবলভাব ক্ষণিকমাত্র। তখনই এদিক ওদিক্‌ চাহিয়া উদ্ধশ্বাসে গগুন লইয়া পলায়ন করিল। কপালকুণ্ডল ভাবিলেন, “ভিক্ষুক দেীড়িল কেন ?" পঞ্চম পরিচ্ছেদ স্বদেশে শপাখোয়ং ষদপি কিল তে যঃ সখীনাং পুরস্তাৎ, কর্ণে লোলং কথয়িতুমভূদাননম্পৰ্শলৈাভাৎ । —মেঘদূত । নবকুমার কপালকুণ্ডলাকে লইয়া স্বদেশে উপনীত হইলেন । নবকুমার পিতৃহীন, তাহার বিধবা মাত৷ গৃহে ছিলেন, আর দুই ভগিনী ছিল । জ্যেষ্ঠা বিধবা ; তাহার সহিত পাঠক মহাশয়ের পরিচয় হইবে না। S、> দ্বিতীয়া শুীমাসুন্দরী সধবা হইয়াও বিধবা, কেন না, তিনি কুলীনপত্নী । তিনি দুই একবার আমাদের দেখা দিবেন । - অবস্থান্তরে নবকুমার অজ্ঞাও কুলশীল তপস্বিনীকে বিবাহ করিয়া গৃহে আনায়, তাহার আত্মীয়স্বজন কত দূর সস্তুষ্টিপ্রকাশ করিতেন, তাই আমরা বলিয়া উঠিতে পারিলাম না । প্রকৃতপক্ষে এ বিষয়ে তাহাকে কোন ক্লেশ পাইতে হয় নাই। সকলেষ্ট ঠাই৷র প্রত্যাগমনপক্ষে নিরাশ্বাস হুইয়াছিল । সহযাত্রীর প্র হ্যাগমন করিয়া রটনা করিয়াছিলেন যে, নবকুমারকে ব্যান্ত্রে হত্যা করিয়াছে । পাঠক মহাশয় মনে করিবেন যে, এই সত্যবাদীরা আত্মপ্রতীতিমতই কহিয়াছিলেন ; -- কিন্তু ইহা স্বীকার করিলে তাঙ্গাদিগের কল্পনাশক্তির অবমাননা করা হয় । প্রত্যাগত যাত্রীর মধ্যে অনেকে নিশ্চিত করিয়া কহিয়াছিলেন যে, নবকুমারকে ব্যাঘ্রমুখে পড়িতে তাহার। প্রত্যক্ষই দৃষ্টি করিয়াছিলেন – কখন কখন বাস্ত্রটার পরিমাণ লইয়। তর্ক বিতর্ক হইল ; কেহ কহিলেন, “ব্যাঘ্রট আট হাত হইবে ।" কেহ কহিলেন, “না। প্রায় চোঁদ হাত ” পূৰ্ব্বপরিচিত প্রাচীন যাত্রী কহিলেন, “যাহা গুউক, আমি বড় রক্ষা পাইয়াছিলাম । বাস্ত্রটা আমাকেষ্ট অগ্ৰে ভাড়৷ করিয়াছিল, আমি পলাইলাম ; নবকুমার তত সাহসী পুরুষ নহে ; পলাইতে পারিল মা ।” যখন এই সকল রটন নবকুমারের মাত প্রভৃতির কর্ণগোচর হইল, তখন পুরমধ্যে এমন ক্ৰন্দনধ্বনি উঠিল যে, কয় দিন তাহার ক্ষান্তি হইল না । একমাত্র পুলের মৃত্যুসংবাদে নবকুমারের মাত একেবারে তপ্রায় হইলেন । এমন সময়ে যখন নবকুমার সঙ্গীক হইয়। বাটী আগমন করিলেন, তখন তাঁহাকে কে জিজ্ঞাসা করে মে, তোমার বধু কোন জাতীয় বা কাহার কন্যা ? সকলেই আহলাদে অন্ধ হইল । নবকুমারের মাত মহা সমাদরে বধু বরণ করিয়া গৃহে লইলেন । যখন নবকুমার দেখিলেন যে, কপালকুণ্ডলা তাহার গৃহমধ্যে সাদরে গৃহীত হইলেন, তখন র্তাহার আনন্দসাগর উছলির উঠিল । অনাদরের ভয়ে তিনি কপালকুণ্ডলা লাভ করিয়াও কিছুমাত্র আহলাদ বা প্রণয়লক্ষণ প্রকাশ করেন নাই – অথচ তাহার হৃদয়াকাশ কপালকুণ্ডলার মূৰ্ত্তিতেই ব্যাপ্ত হইয়া রহিয়াছিল । এই আশঙ্কাতেই তিনি কপালকুণ্ডলার পাণিগ্রহণ প্রস্তাবে অকস্মাৎ সন্মত হয়েন নাই ; এই আশঙ্কাতেই পাণিগ্রহণ করিয়াও গৃহাগমন পর্য্যন্তও বারেকমাত্র