পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (তৃতীয় ভাগ).djvu/১৮৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


কপালকুণ্ডল ○ সহসা কপালকুণ্ডল বাকৃশক্তি পুনঃপ্রাপ্ত হইলেন তিনি উত্তর না দিয়া কহিলেন, “আমিও তাঁহাই জিজ্ঞাসা করিতেছি। এ কাননমধ্যে তোমরা দুই জনে এ নিশীথে কি কুপরামর্শ করিতেছিলে ?” ব্রাহ্মণবেশী কিছুকাল নিরুত্তরে চিন্তামগ্ন হইয়। রছিলেন । যেন কোন নুতন ইষ্টসিদ্ধির উপায় তাহার চিত্তমধ্যে আসিয়ু উপস্থিত হইল । তিনি কপালকুণ্ডলীর হস্তধারণ করিলেন এবং হস্ত ধরিয় ভগ্ন গৃহ হইতে কিছু দূরে লইয়। যাইতে লাগিলেন। কপালকুণ্ডলা অতি ক্রোধে হস্ত মুক্ত করিয়া লইলেন । ব্রাহ্মণবেশী অতি মুদুম্বরে কপালকুণ্ডলার কানের কাছে কহিলেন, “চিন্তা কি ? আমি পুরুষ নহি ।” কপালকুণ্ডল। আরও চমৎকৃত হইলেন । এ কথায় তাহার কতক বিশ্বাস হইল, সম্পূর্ণ বিশ্বাসও হইল না । তিনি ব্রাহ্মণবেশবরিণীর সঙ্গে সঙ্গে গেলেন। ভগ্ন গৃহ হইতে অদৃষ্ঠ স্থানে গিয়৷ ব্রাহ্মণবেশী কপালকুণ্ডলাকে কণে কৰ্ণে কহিলেন, “আমর। যে কুপরামর্শ করিতেছিলাম, তাহ শুনিবে ? সে তোমারই সম্বন্ধে ” কপালকুণ্ডলার ভয় এবং আগ্রহ অতিশয় বাড়িল । কহিলেন, “শুনিব ।” ছদ্মবেশী কহিলেন, “তবে যতক্ষণ না প্রত্যাগমন করি, ততক্ষণ এই স্থানে প্রতীক্ষা কর।” এই বলিয়া ছদ্মবেশী ভগ্নগৃহে প্রত্যাগমন করিলেন ; কপালকুণ্ডল কিয়ৎক্ষণ তথায় বসিয়। রহিলেন । কিন্তু যাহা দেখিয়াছিলেন ও শুনিয়াছিলেন, তাহাতে তাহার অতি উৎকট ভয় জন্মিয়াছিল। এক্ষণে একাকিনী অন্ধকার বনমধ্যে বসিয়া থাকাতে আরও ভয় বাড়িতে লাগিল । বিশেষ এই ছদ্মবেশী তাহাকে কি অভিপ্রায়ে তথায় বসাইয়া রাখিয়া গেল, তাহা কে বলিতে পারে ? হয় ত সুযোগ পাইয়া আপনার মন্দ অভিপ্রায় সিদ্ধ করিবার জন্তই বসাইয়া রাখিয়া গিয়াছে। এইরূপ আলোচনা করিয়া কপালকুণ্ডল ভীতি বিহ্বল হইলেন। এদিকে ব্রাহ্মণবেশীর প্রত্যাগমনে অনেক বিলম্ব হইতে লাগিল। কপালকুণ্ডলা আর বসিতে পারিলেন না ; উঠিয়া দ্রুতপাদবিক্ষেপে গৃহাভিমুখে চলিলেন। তখন আকাশমণ্ডল ঘনঘটায় মসীময় হইয়। আসিতে লাগিল ; কাননতলে যে সামান্ত আলো ছিল, তাহাও অন্তর্হিত হইতে লাগিল ৷ কপালকুণ্ডল আর তিলাৰ্দ্ধ বিলম্ব করিতে পারিলেন না । শীঘ্রপদে কাননাভ্যস্তর হইতে বাহিরে আসিতে লাগিলেন । আসিবার সময়ে যেন পশ্চাদ্ভাগে অপর ব্যক্তির পদক্ষেপধ্বনি শুনিতে পাইলেন । কিন্তু মুখ ফিরাইয়া অন্ধকারে কিছু দেখিতে পাইলেন না। কপালকুণ্ডল৷ মনে করিলেন, ব্রাহ্মণবেশী তাহার পশ্চাৎ আসিতেছেন । বনত্যাগ করিয়া পুৰ্ব্ববর্ণিত ক্ষুদ্র বনপথে আসিয়া বাহির হইলেন । তথায় তাদৃশ অন্ধকার নহে ; দৃষ্টিপথে মনুষ্য থাকিলে দেখা যায়। কিন্তু কিছুই দেখা গেল না । অতএব দ্রুতপদে চলিলেন, কিন্তু আবার স্পষ্ট মনুষ্যগতিশব্দ শুনিতে পাইলেন । আকাশ নীলকাদম্বিনীতে ভাষণতর হইল। কপালকুণ্ডল৷ আরও দ্রুত চলিলেন । গৃহ অনতিদূরে, কিন্তু গৃহপ্রাপ্তি হইতে ন হইতেই প্রচণ্ড ঝটিকাবৃষ্টি ভীষণরবে প্রঘোষিত হইল। কপালকুণ্ডল দৌড়িলেন । পশ্চাতে যে আসিতেছিল, সেও যেন দৌড়িল, এমন শব্দ বোধ হইল। গৃহ দৃষ্টিপথবর্তী হইবার পূৰ্ব্বেই প্রচণ্ড ঝটিকাবৃষ্টি কপালকুণ্ডলার মস্তকের উপর দিয়া প্রধ+ বিত হইল । ঘন ঘন গম্ভীর মেঘশব্দ এবং অশনিসম্পতিশব্দ হক্টতে লাগিল । ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকিতে লাগিল । মুষলধারে বৃষ্টি পড়িতে লাগিল ! কপালকুণ্ডল কোনক্রমে আত্মরক্ষা করিয়৷ গৃহে আসিলেন । প্রাঙ্গণভূমি পার হইয়া প্রকোষ্ঠমধ্যে উঠিলেন । দ্বার তাহার জন্ত খোল ছিল । দ্বার রুদ্ধ করিবার জন্য প্রাঙ্গণের দিকে সম্মুখ ফিরিলেন। বোধ হইল যেন, প্রাঙ্গণ-ভূমিতে এক দীঘাকার পুরুষ দাড়াইয়৷ আছে । এই সময়ে একবার বিদ্যুৎ চমকিল । একবার বিদ্যুতেই তাইকে চিনিতে পারিলেন । সে সাগরতীর-প্রবাসী সেই কাপালিক । তৃতীয় পরিচ্ছেদ স্বপ্নে “I l,ad a di eam, which was not all a dream.” —Iłyron. কপালকুণ্ডলা ধীরে ধীরে দ্বার রুদ্ধ করিলেন। দ্বীরে ধীরে শয়নাগারে আসিলেন, ধীরে ধীরে পালঙ্কে শয়ন করিলেন । মনুষ্যহৃদয় অনস্ত সমুদ্র, যখন তত্পরি ক্ষিপ্ত বায়ুগণ সমর করিতে থাকে কে তাহার তরঙ্গমালা গণিতে পারে ? কপালকুণ্ডলার হৃদয়সমুদ্রে যে তরঙ্গমালা উৎক্ষিপ্ত হইতেছিল, কে তাহু গণিবে ? সে রাত্রে নবকুমার হৃদয়বেদনায় অস্তঃপুরে আইসেন নাই। শয়নাগারে একাকিনী কপালকুণ্ডল