পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (তৃতীয় ভাগ).djvu/১৯১

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


কপালকুণ্ডল অধঃপাত হয় নাই যে, আমি নিরপরাধা বালিকার মৃত্যুসাধন করি । আমি তাহাতে সন্মতি দিলাম না। এই সময়ে তুমি তথায় উপস্থিত হইয়াছিলে । বোধ করি, কিছু শুনিয়া-থাকিবে । কপী । আমি ঐরূপ বিতর্কই শুনিয়াছিলাম । লু। সে ব্যক্তি আমাকে অবোধ অজ্ঞান বিবেচনা করিয়া কিছু উপদেশ দিতে চাহিল । শেষটা কি দাড়ায়, ইহ জানিয়া তোমায় উচিত সংবাদ দিব বলিয়া তোমাকে বনমধ্যে অন্তরালে রাখিয়া গেলাম । কপ। । তার পর আর ফিরিয়া অসিলে না কেন ? লু। তিনি অনেক কথা বলিলেন, বাহুল্যবৃত্তান্ত শুনিতে শুনিতে বিলম্ব হইল । তুমি সে ব্যক্তিকে বিশেষ জান ! কে সে, অনুভব করিতে পারিতেছ? কপ। আমার পূৰ্ব্বপালক কাপালিক । লু। সেই বটে, কাপালিক প্রথমে তোমাকে সমুদ্রতীরে প্রাপ্তি, তথায় প্রতিপালন, নবকুমারের আগমন, তৎসহিত তোমার পলায়ন, এ সমুদায় পরিচয় দিলেন । তোমাদের পলায়নের পর যাহা যাহা হইয়াছিল, তাহীও বিবরিত করিলেন । সে সকল বৃত্তান্ত তুমি জান না । তাহ তোমার গোচরার্থ বিস্তারিত বলিতেছি । এই বলিয়া লুৎফউল্লিস কাপালিকের শিখরচু্যতি, হস্তভঙ্গ, স্বপ্ন, সকল ব{ললেন । স্বপ্ন শুনিয়া কপালকুণ্ডলা চমকিয়া, শিহরিয়া উঠিলেন—চিত্তমধ্যে বিদ্যুচ্চঞ্চল হইলেন । লুৎফউল্লিস। বলিতে লাগিলেন, “কাপালিকের দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ভবানীর আজ্ঞাপ্রতিপালন । বাহু বলহীন, এই জন্য পরের সাহায্য তাহার নিতাস্ত প্রয়োজন । আমাকে ব্ৰাহ্মণ-তনয় বিবেচনা করিয়া সস্থায় করিবার প্রত্যাশায় সকল বৃত্তান্ত বলিল । আমি এ পর্য্যস্ত এ দুষ্কৰ্ম্মে স্বীকৃত হই নাই। এ দুৰ্ব্বত্ত চিত্তের কথা বলিতে পারি না, কিন্তু ভরসা করি যে, কখনই স্বীকৃত হইব না। বরং এ সঙ্কল্পের প্রতিকুলতাচরণ করিব, এই অভিপ্রায় ; সেই অভিপ্রায়েই আমি তোমার সহিত সাক্ষাৎ করিলাম। কিন্তু এ কার্য নিতান্ত অস্বার্থপর হইয়া করি নাই । তোমার প্রাণদান দিতেছি । তুমি আমার জন্য কিছু কর ।” কপালকুণ্ডলী কহিলেন, “কি করিব?" লু। আমারও প্রাণদান দাও—স্বামী ত্যাগ কর । কপালকুণ্ডলা অনেকক্ষণ কথা কহিলেন না । অনেকক্ষণের পর কহিলেন, “স্বামী ত্যাগ করিয়৷ কোথায় যাইব ?” 8& লু। বিদেশে--বহুদূরে, তোমাকে অট্টালিকা দিব—ধন দিব—দাসদাসী দিব, রাণীর দ্যায়ু থাকিবেকপালকুণ্ডলা আবার চিন্তা করিতে লাগিলেন, পৃথিবীর সূৰ্ব্বত্র মানস লোচনে দেখিলেন—কোথাও ” কাহাকে দেখিতে পাইলেন না । অস্তঃকরণমধ্যে দৃষ্টি করিয়া দেখিলেষু—তথায় তৃ নবকুমারকে দেখিতে পাইলেন না, তবে কেন লুৎফউন্নিসার সুখের পথ রোধ করিবেন ? লুৎফ উন্নিসাকে কহিলেন, “তুমি আমার উপকার করিয়াছ কি না, তাহা আমি এখন বুঝিতে পারিতেছি না। অট্টালিকা, ধন, সম্পত্তি, দাসদাসীরও প্রয়োজন নাই । আমি তোমার মুখের পথ কেন রোধ করিব ? তোমার মানস সিদ্ধ হউক— কালি হইতে বিঘ্নকারিণীর কোন সংবাদ পাইবে না । অামি বনচর ছিলাম, আবার বনচর হুইব ।” লুৎফ উন্নিসা চমৎক্লত হইলেন, এরূপ আশু স্বীকারের কোন প্রত্যাশ করেন নাই । মোহিত হইয়া কহিলেন, “ভগিনি- তুমি চিরায়ুষ্মতী হও, আমার জীবনদান করিলে । কিন্তু আমি তোমাকে অনাথ হইয়া যাইতে দিব না । কল্য প্রাতে তোমার নিকট আমার এক জন বিশ্বাসযোগ্য। চতুর দাসী পাঠাইব । তাহার সঙ্গে যাইও । বৰ্দ্ধমানে কোন অতিপ্রধান। স্ত্রীলোক আমার মুহৃৎ—তিনি তোমার সকল প্রয়োজন সিদ্ধ করিবেন ।” লুৎফ উল্লিস এবং কপালকুণ্ডল এরূপ মনঃসংযোগ করিয়া কথাবাৰ্ত্ত কহিতেছিলেন যে, সম্মুখবিঘ্ন কিছুই দেখিতে পান নাই । যে বস্তৃপথ তাহাদিগের আশ্রয়স্থান হইতে বাহির হইয়াছিল, সে পথপ্রান্তে দাড়াইয়৷ কাপালিক ও নবকুমার তাহাদিগের প্রতি ষে করাল দৃষ্টিপাত করিতেছিলেন, তাহ কিছুই দেখিতে পান নাই । নবকুমার ও কাপাণিক ইহুদিগের প্রতি দৃষ্টি করিয়াছিলেন মাত্র, কিন্তু ভাগ্যবশতঃ ততদুর হইতে তাহাদিগের কথোপকথনের মধ্যে কিছুই তদুভয়ের শ্রতিগোচর হইল না। মনুষ্যের চক্ষুকৰ্ণ যদি সমদুর গামী হুইত, তবে মনুষ্যের স্থঃখম্রো ও শমিত কি বৰ্দ্ধিত হুইত, তাহ কে বলিবে ? লোকে বলিয়া থাকে, সংসাররচনা অপূৰ্ব্ব কৌশলময় ! নবকুমার দেখিলেন, কপালকুণ্ডল আলুলায়িতকুন্তলা। যখন কপালকুণ্ডলা তাহার হয় নাই, তখনই সে কুন্তল বাধিত না । আবার দেখিলেন যে, সেই কুন্তলরাশি আসিয়া ব্রাহ্মণকুমারের পুষ্ঠদেশে পড়িয়। র্তাহার অংসসম্বিলম্বী কেশদামের সহিত মিশিয়াছে। কপালকুণ্ডলার কেশরাশি ঈদৃশ আয়তনশালী এবং