পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (তৃতীয় ভাগ).djvu/১৯৯

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


দেবী ਾਂ t দিয়াছিলেন। তাই আজ সে বাড়ীতে প্রবেশ করিতে প্রফুল্লের মা'র প৷ কঁাপিতেছিল। কিন্তু ষখন আসা হইয়াছে, তখন আর ফেরা যায় না । কন্যা ও মাত সাহসে ভর করিয়া গৃহমধ্যে প্রবেশ করিল। তখন কৰ্ত্ত অন্তঃপুরমধ্যে আপরাক্লিক নিদ্রার মুখে অভিভূত । গৃহিণী—অর্থাৎ প্রফুল্পের শাশুড়ী, পা ছড়াইয়া পাকাচুল তুলাইতেছিলেন, এমন সময়ে সেখানে প্রফুল্ল ও তাঁহার মা উপস্থিত হইল । প্রফুল্ল মুখে আধ হাত ঘোমটা টানিয়া দিয়াছিল। তাহার বয়স এখন আঠার বৎসর । গিল্পী ইহাদিগকে দেখিয়া বলিলেন, “তোমরা কে গা ?” প্রফুল্পের মা দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া বলিলেন, “কি বলিয়াই বা পরিচয় দিব ?” গিল্পী । কেন, পরিচয় আবার কি বলিয়া দেয় ? প্রফুল্লের মা । আমরা কুটুম্ব । গিন্নী। কুটুম্ব ? কে কুটুম্ব গ৷ ? সেখানে তারার মা বলিয়া এক জন চাকরাণী কাজ করিতেছিল। সে দুই একবার প্রফুল্লদিগের বাড়ী গিয়াছিল— প্রথম বিবাহের পরেই। সে বলিল, “ওগো, চিনেছি গো ! ওগো চিনেছি! কে ! বেহান ?” (সেকালে পরিচারিকার গৃহিণীর সম্বন্ধ ধরিত । ) গিল্পী । বেহান ? কোন বেহান ? তারার মা । তুর্গাপুরের বেহান গো—তোমার বড় ছেলের বড় শাশুড়ী । গিনী বুঝিলেন । মুখটা অপ্রসন্ন হইল। বলিলেন, “বসে।” বেহান বসিল—প্রফুল্ল দাড়াইয়া রহিল । গিন্নী জিজ্ঞাসা করিলেন, “এ মেয়েটি কে গা ?” প্রফুল্পের মা বলিল, “ তোমার বড় বউ ।” গিয়ী বিমর্ষ হইয়া কিছুকাল চুপ করিয়া রছিলেন । পরে বলিলেন, “তোমরা কোথায় এসেছিলে ?” প্রফুল্পের মা ! তোমার বাড়ীতেই এসেছি । গিল্পী । কেন গা ? প্র, মা । কেন, আমার মেয়েকে কি শ্বশুরবাড়ীতে আসিতে নাই ? গিল্পী । আসিতে থাকিবে না কেন ? শ্বশুরশাগুড়ী যখন আনিবে, তখন আসিবে। ভাল মামু ষের মেয়ে-ছেলে কি গায়ে পড়ে আসে ? প্র, মা । শ্বশুর শাশুড়ী যদি সাত জন্মে নাম না করে ? গিল্পী । নামই যদি না করে—তবে আসা কেন ? প্র, মা। খাওয়ায় কে ? আমি বিধবা অনা ; থিনী, তোমার বেটার বউকে আমি খাওয়াই কোথা । থেকে ? গিল্পী । যদি খাওয়াতেই পারিবে না, তবে পেটে ধরেছিলে কেন ? প্র, মা । তুমি কি খাওয়-পরা হিসাব করিয়া বেটা পেটে ধরেছিলে ? তা হলে সেই সঙ্গে বেটার বউয়ের খোরাক-পোষাকটা ধরিয়া নিতে পার নাই ? গিল্পী। অা মলো ! মাগী বাড়ী বয়ে কোদল কবৃতে এসেছে দেখি ষে ? - প্র, মা ! না, কোদল করিতে আসি নাই, তোমার বউ একা আসতে পারে না, তাই রাখিতে সঙ্গে আসিয়াছি। এখন তোমার বউ পৌছিয়াছে, আমি চলিলাম । এই বলিয়া প্রফুল্লর মা বাটার বাহির হইয়া চলিয়া গেল । অভাগীর তখনও আহার হয় নাই । মা গেল, কিন্তু প্রফুল্ল গেল না । যেমন ঘোমটা দেওয়া ছিল, তেমনই ঘোমটা দিয়া দাড়াইয়া রহিল। শাশুড়ী বলিল, “তোমার মা গেল, তুমিও যাও।” প্রফুল্ল নড়ে না । গিল্পী । নড় না যে ? প্রফুল্ল নড়ে না ! গিন্নী । কি জ্বালা ! আবার কি তোমার সঙ্গে একটা লোক দিতে হবে না কি ? এবার প্রফুল্ল মুখের ঘোমটা খুলিল ; চাদপান. মুখ ; চক্ষে দরূদর ধারা বহিতেছে । শাশুড়ী মনে মনে ভাবিলেন, “আহা ! এমন চাদপান বউ নিয়ে ঘর করতে পেলেম ন৷ ” মন একটু নরম হলো . প্রফুল্ল অতি অন্মুটস্বরে বলিল, “আমি যাইব বলিয়া আসি নাই ।” গিল্পী। তা কি করিব মা—আমার কি অসাধ যে, তোমায় নিয়ে ঘর করি ? লোকে পাচ কথা বলে—একঘরে করবে বলে, কাজেই তোমাকে ত্যাগ করতে হয়েছে ! প্রফুল্ল । মা, একঘরে হবার ভয়ে কে কবে সন্তান ত্যাগ করেছে ? আমি তোমার সস্তান নই ? শাশুড়ীর মন আরও নরম হলো । বলিলেন, “কি কর্ব মা, জেতের ভয় ।” প্রফুল্ল পূৰ্ব্ববৎ অস্ফুটস্বরে বলিল, “হলেম যেন আমি অজাতি—কত শূদ্র তোমার ঘরে দাসীপনা করিতেছে—আমি তোমার ঘরে দাসীপনা করিতে । দোষ কি ?”