পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (তৃতীয় ভাগ).djvu/২১০

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


)\ు করিয়া চারিদিক্ নিরীক্ষণ করিল। দেখিল, এখনও দুই চারিট ঘর অভগ্ন আছে। মনে করিল, এখানে মানুষ থাকিলেও থাকিতে পারে। প্রফুল্ল সেই সকল ঘরের ভিতর প্রবেশ করিতে গেল। দেখিল, সকল ঘরের দ্বিার খোলা—মনুষ্য নাই। অথচ মনুষ্যবাসের চিহ্নও কিছু কিছু আছে। ক্ষণপরে প্রফুল্ল কোন বুড়ামানুষের কাতরাণি শুনিতে পাইল। শব্দ লক্ষ্য করিয়া প্রফুল্ল এক কুঠরীমধ্যে প্রবেশ করিল। দেখিল, সেখানে এক বুড়া শুইয়া কাতরাইতেছে। বুড়ার শীর্ণ দেহ, . শুষ্ক ওষ্ঠ, চক্ষু কোটরগত, ঘন শ্বাস। প্রফুল্ল বুঝিল, ইহার মৃত্যু নিকট । গিয়া দাড়াইল । বুড়া প্রায় শুষ্ককণ্ঠে বলিল, “ম, তুমি কে ? তুমি কি কোন দেবতা, মৃত্যুকালে আমার উদ্ধারের জন্য আসিলে ?” প্রফুল্ল বলিল, “আমি অনাথ। । পথ ভুলিয়া এখানে আসিয়াছি। তুমিও দেখিতেছি অনাথ, তোমার কোন উপকার করিতে পারি ?” বুড়া বলিল, “অনেক উপকার এ সময়ে করিতে পার। জয় নন্দদুলাল ! এ সময়ে মনুষ্যের মুখ দেখিতে পাইলাম, পিপাসায় প্রাণ যায়—একটু জল দাও।” * প্রফুল্ল দেখিল, বুড়ার ঘরে জল কলসী আছে, কলসীতে জল আছে, জলপাত্র অাছে। কেবল দিবার লোক নাই। প্রফুল্ল জল আনিয়া বুড়াকে খাওয়াইল । বুড়া জল পান করিয়া কিছু সুস্থির হইল। প্রফুল্ল এই অরণ্যমধ্যে মুমুধু বৃদ্ধকে একাকী এই অবস্থায় দেখিয়া বড় কৌতুহলী হইল। কিন্তু বুড়া তখন অধিক কথা কহিতে পারে না । প্রফুল্ল সুতরাং তাহার সবিশেষ পরিচয় পাইল না । বুড়া ষে কয়টি কথা বলিল, তাহার মৰ্ম্মার্থ এই ঃ– বুড়া বৈষ্ণব । তাহার কেহই নাই, কেবল এক বৈষ্ণবী ছিল । বৈষ্ণবী বুড়াকে মুমু দেখিয় তাহার দ্রব্যসামগ্ৰী যাহা ছিল, তাহ লইয়া পলাইয়াছে । বুড়া বৈষ্ণব—তাহার দাহ হইবে না, বুড়ার কবর হয়, এই ইচ্ছা, বুড়ার কথামত বৈষ্ণবী বাড়ীর উঠানে তাহার একটি কবর কাটিয়া রাখিয়া গিয়াছে। হয় ত সাবলকোদালি সেইখানে পড়িয়া আছে। বুড়া এখন প্রফুল্লের কাছে এই ভিক্ষ চাহিল যে, “আমি মরিলে সেই কবরে আমাকে টানিয়া ফেলিয়া দিয়া মাটী চাপা দিও। প্রফুল্ল স্বীকৃত হইল । তার পর বুড়া বলিতে লাগিল, “আমার কিছু টাকা পোতা আছে। বৈষ্ণবী প্রফুল্ল তাহার শয্যার কাছে ন। তাহা হইলে না লইয়া পলাইত না । সে টাকাগুলি কাহাকে না দিয়া গেলে আমার প্রাণ বাহির হইবে না। যদি কাহাকে না দিয়া মরি, তবে যক্ষ হইয়া টাকার কাছে ঘুরিয়া বেড়াইব-আমার গতি হইবে না । বৈষ্ণবীকে সেই টাকা দিব মনে করিয়াছিলাম, কিন্তু সে ত পলাইয়াছে। আর কোম্ মমুন্যের সাক্ষাৎ পাইব ? তাই তোমাকেই সেই টাকাগুলি দিয়৷ যাইতেছি । আমার বিছানার নীচে একখানি চৌকা তক্ত পাতা আছে। সেই তক্তাখানি তুলিবে । একটা সুড়ঙ্গ দেখিতে পাইবে । বরাবর সিড়ি আছে। সেই সিড়ি দিয়া নামিবে— ভয় নাই— আলো লইয়া ষাইবে । নীচে মাটীর ভিতর এমনি একটা ঘর দেখিবে । সেই ঘরের বায়ুকোণে খুজিও —টাক পাইবে ।” প্রফুল বুড়ার শুশ্রুষায় নিযুক্ত রহিল। বুড়া বলিল, “এই বাড়ীতে গোয়াল আছে—গোয়ালে গরু আছে । গোয়াল হইতে যদি দুধ দুইয়। আনিতে পার, তবে একটু আনিয়া আমাকে দাও—একটু আপনি খাও ।” প্রফুল্ল তাহাই করিল—দুধ আনিবার সময় দেখিয়া আসিল কবর কাট৷—সেখানে কোদালীশাবল পড়িয়৷ আছে । অপরাহ্লে বুড়ার প্রাণবিয়োগ হইল। প্রফুল্ল তাহাকে তুলিল-বুড়া শীর্ণকায় ; সুতরাং লঘু ; প্রফুল্লের বল যথেষ্ট। প্রফুল্প তাহাকে লইয়া গিয়৷ কবরে শুয়াইয়া মাটী চাপ। দিল । পরে নিকটস্থ কুপে স্নান করিয়া ভিজা কাপড় আধখানা পরিয়া রৌদ্রে শুকাইল । তার পর কোদালী-শাবল লইয়া বুড়ার টাকার সন্ধানে চলিল। বুড়া তাম্বাকে টাকা দিরা গিয়াছে—সুতরাং লইতে কোন বাধা আছে, মনে করিল না । প্রফুল্ল দীন-দুঃখিনী । নবম পরিচ্ছেদ প্রফুল্ল বুড়াকে সমাধি মন্দিরে প্রোথিত করিবার পূৰ্ব্বেই তাহার শয্যা তুলিয়া বনে ফেলিয়া দিয়াছিল, —দেখিয়াছিল যে, শষ্যার নীচে যথার্থই একখানি চৌকা তক্ত ; দীৰ্ঘে প্রস্থে তিন হাত হইবে, মেজেতে বসান আছে। এখন শাবল আনিয়া, তাহার চাড়ে তক্ত উঠাইল—অন্ধকার গহবর দেখা দিল। ক্রমে অন্ধকারে প্রফুল্ল দেখিল, নামিবার একটা সিড়ি আছে বটে । সে সন্ধান জানিত