পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (তৃতীয় ভাগ).djvu/২২৬

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


ర్చి তখন সে স্ত্রীলোক বলিল, “তোমরা কি কেউ অামায়’চেন না ? সাগর বলিল, “না—কে তুমি ?” তখন সেই স্ত্রীলোক উত্তর করিল, “আমি দেবী চৌধুরাণী ।” পরিচারিকার হাতে পানের বাট ছিল, ঝন ঝন করিয়া পড়িয়া গেল। সেও কঁাদিতে কঁাদিতে আঁ— তা—আঁ—আঁ৷ শব্দ করিতে করিতে বসিয়া পড়িল । কাকালের কাপড় খসিয়া পড়িল । দেবী চৌধুরাণী তাহার দিকে ফিরিয়া বলিল, “চুপ রহে, হারামজাদি । খাড়া রহে ।” পরিচারিক কাদিতে কঁদিতে উঠিয়া স্তম্ভিতের স্তায় দাড়াইয়া রহিল । সাগরেরও গায়ে ঘাম দিতেছিল। সাগরের মুখেও কথা ফুটিল না । যে নাম তাহদের কানে প্রবেশ করিয়াছিল, ভাহা ছেলে বুড়ে কে না শুনিয়াছিল ? সে নাম অতি ভয়ানক ! কিন্তু সাগর আবার ক্ষণেক পরে হাসিয়া উঠিল । তখন দেবী চৌধুরাণীও হাসিল । তৃতীয় পরিচ্ছেদ

  • বর্ষাকাল। রাত্রি জ্যোৎস্ন। জ্যোৎস্ন। এখন বড় উজ্জল নয়, বড় মধুর, একটু অন্ধকারমাখা-পুথিবী স্বপ্নময় আবরণের মত । ত্রিস্রোতা নদী বর্ষাকালের জলপ্লাবনে কুলে কুলে পরিপূর্ণ। চন্দ্রের কিরণ সেই তীব্ৰগতি নদীজলের স্রোতের উপর—শ্রোতে, আবর্তে, কদাচিৎ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তরঙ্গে জলিতেছে। কোথাও জল একটু ফুটিয়া উঠিতেছে, সেখানে একটু চিকিমিকি ; কোথাও চরে ঠেকিয়া ক্ষুদ্র বীচি ভগ্ন হইতেছে, সেখানে একটু ঝিকিমিকি । তীরে গাছের গোড়ায় জল আসিয়া লাগিয়াছে—গাছের ছায়া পড়িয়া সেখানে জল বড় অন্ধকার ;–অন্ধকারে গাছের ফুল, ফল, পাতা বাহিরা, তীব্র স্রোত চলিতেছে ; তীরে ঠেকিয়৷ জল একটু তর-তর কলকল পতপত শব্দ করিতেছে— কিন্তু সে আঁধারে আঁধারে । আঁধারে, আঁধারে সেই বিশাল জলধারা সমুদ্রানুসন্ধানে পক্ষিণীর বেগে ছুটিয়াছে। কুলে কুলে অসংখ্য কলকল শব্দ, আবর্তের ঘোর গর্জন, প্রতিহত স্রোভের তেমনি গর্জন ; সৰ্ব্বশুদ্ধ, একটা গম্ভীর গগনব্যাপী শব্দ উঠিতেছে ।

সেই ত্রিস্রোতের উপরে কুলের অনতিদূরে একখানি বজরা বাধা আছে। বজরার অনতিদূরে, একটা বড় তেঁতুলগাছের ছায়ায়, অন্ধকারে আর একখানি নৌকা আছে—তাহার কথা পরে বলিব, বঙ্কিমচন্দ্রের গ্রন্থাবলী আগে বজরার কথা বলি। বজরাখানি নানাবর্ণে চিত্রিত ; তাহাতে কত রকম মুরদ আঁকা আছে। তাহার পিতলের হাতল দাণ্ড প্রভৃতিতে রূপার গিল্টি। গলুইয়ে একটা হাঙ্গরের মুখ ; সেটাও গিল্ট করা । সৰ্ব্বত্র পরিষ্কার—পরিচ্ছন্ন, উজ্জল, আবার নিস্তব্ধ । নাবিকেরা এক পাশে বাশের উপর পাল ঢাকা দিয়া গুইয়া আছে ; কেহ জাগিয়া থাকার চিহ্ন নাই । কেবল বজরার ছাদের উপর এক জন মানুষ । অপূৰ্ব্ব দৃষ্ঠ ! ছাদের উপর একখানি ছোট গালিচা পাতা । গালিচাখানি দুই আঙ্গুল পুরু—বড় কোমল, নানাবিধ চিত্রে চিত্রিত। গালিচার উপর বসিয়া এক জন স্ত্রীলোক । তাহার বয়স অনুমান করা ভার-পচিশ বৎসরের নীচে তেমন পূর্ণায়ত দেহ দেখা যায় না ; পচিশ বৎসরের উপর তেমন সোঁবনের লাবণ্য কোথাও পাওয়া যায় না । বয়স যাই হউক, সে স্ত্রীলোক পরমাসুন্দরী, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই । এ সুন্দরী কৃশাঙ্গী নহে—অথবা স্থলাঙ্গী বলিলেও ইহার নিন্দ হইবে । বস্তুতঃ ইহার অবয়ব সৰ্ব্বত্র ষোলকলা সম্পূর্ণ—আজি রিস্রোতা যেমন কুলে কুলে পূরিয়াছে —ইহারও শরীর তেমনই কুলে কুলে পূরিয়াছে । তার উপর বিলক্ষণ উন্নত দেহ ! দেহ তেমন উন্নত বলিয়াই, স্থলাঙ্গী বলিতে পারিলাম না । যৌবন-বর্ষার চারি পোয় বন্যার জল, সে কমনীয় আধারে ধরিয়াছে—ছাপায় নাই। কিন্তু জল কুলে কুলে পূরিয়া টল টল কবিতেছে—অস্থির হইয়াছে। জল অস্থির, কিন্তু নদী অস্থির নহে ; নিস্তরঙ্গ । লাবণ্য চঞ্চল, কিন্তু সে লাবণ্যময়ী চঞ্চলা নহে—নিৰ্ব্বিকার । সে শান্ত, গম্ভীর, মধুর, অথচ আনন্দময়ী ; সেই জ্যোৎস্নাময়ী নদীর অনুসঙ্গিনী । সেই নদীর মত, সেই সুন্দরীও বড় সুসজ্জিত। এখন ঢাকাই কাপড়ের তত মৰ্য্যাদ| নাই—কিন্তু একশত বৎসর আগে কাপড়ও ভাল হুইত, উপযুক্ত মৰ্য্যাদাও ছিল । ইহার পরিধানে একখানি পরিস্কার মিহি ঢাকাই, তাতে জরির ফুল । তাহার ভিতর হীরা-মুক্ত-খচিত কঁাচলি ঝকমক্‌ করিতেছে ; হীরা, পাল্লা, মতি, সোনায় সেই পরিপূর্ণ দেহ মণ্ডিত ; জ্যোৎস্নার আলোকে বড় ঝকৃমক্‌ করিতেছে । নদীর জলে যেমন চিকিমিকি —এই শরীরেও তাই। জ্যোৎস্না-পুলকিত স্থির নদীজলের মত—সেই শুভ্র বসন ; আর জলে মাঝে মাঝে যেমন জ্যোৎস্নার চিকিমিকি—ঝিকিমিকি— শুভ্র বসনের মাঝে মাঝে তেমনই হীরা, মুক্ত, মতির চিকিমিকি । আবার নদীর যেমন তীরবর্তী