পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (তৃতীয় ভাগ).djvu/২২৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


দেবী বনচ্ছায়া, ইহারও তেমনই অন্ধকার কেশরাশি আলুলায়িত হইয়া অঙ্গের উপর পড়িয়াছে ; র্কোকড়াইয়া, ঘুরিয়া ঘুরিয়া, ফিরিয়া ফিরিয়া, গোছায় গোছায় কেশ পৃষ্ঠে, অংসে, বাহুতে, বক্ষে পড়িয়াছে ; তার মন্থণ কোমল প্রভার উপর চাদের আলে৷ খেলা করিতেছে ; তাহার সুগন্ধি চূর্ণ গন্ধে গগন পরিপূরিত হইয়াছে, একছড়া যুঁইফুলের গোড়ে সেই কেশরাজি সংবেষ্টন করিতেছে । ছাদের উপর গালিচা পাতিয়া, সেই বহুরত্নমণ্ডিত রূপবতী মূৰ্ত্তিমতী সরস্বতীর ন্যায় বীণাবাদনে নিযুক্ত । চন্দ্রের আলোয় জ্যোৎস্নার মত বর্ণ মিশিয়াছে ; তাহার সঙ্গে সেই মুহূমধুর বীণের ধ্বনিও মিশিতেছে—যেমন জলে জলে চন্দ্রের কিরণ খেলিতেছে, যেমন এ সুন্দরীর অলঙ্কারে চাদের আলো খেলিতেছে, এ বন্যকুসুমসুগন্ধি কৌমুদী স্নাত বায়ুস্তর সকলে সেই বীণার শব্দ তেমনি খেলিতেছিল । ঝমৃঝম্ ছন্‌ছন বানন ঝনন্‌ ছন্ন দম্‌দম্‌ দ্রিম্ দ্রিম্ বলিয়া বীৰ্ণে কত কি বাজিতেছিল, তাহা আমি বলিতে পারি না । বীণ। কখন কাদে, কখন রাগিয়া উঠে-কখন নাচে, কখন আদর করে, কখন গর্জিয় উঠে—বাজিয়ে টিপি টিপি হাসে । ঝিঁঝিট, খাম্বাজ, সিন্ধু—কত মিঠে রাগিণী বাজিল —কেদার, হাম্বির, বেহাগ—কত গম্ভীর রাগিণী বাজিল —কানাড়া, সাহান, বাগীশ্বরী—কত জীকাল রাগিণী বাজিল । নাদ, কুসুমের মালার মত নদীকল্লোলস্রোতে ভাসিয়া গেল । তার পর দুই একটি পর্দা উঠাইয়া নামাইয়া লইয়া, সহসা নুতন উৎসাহে উন্মুখী হইয়া, সে বিদ্যাবতী ঝন ঝন্‌ করিয়া বাণের তারে বড় বড় ঘা দিল । কানের পিপুলপাত ফুলিয়া উঠিল, মাথায় সাপের মত চুলের গোছ। সব নড়িয়া উঠিল—বীণে নট-রাগিণী বাজিতে লাগিল । তখন ষাহারা পাল মুড়ি দিয়া এক প্রাস্তে নিঃশব্দে নিদ্রিতবৎ গুইয়াছিল, তাহার মধ্যে এক জন উঠিয়া আসিয়া নিঃশব্দে সুন্দরীর নিকট দাড়াইল । এ ব্যক্তি পুরুষ । সে দীর্ঘকায় ও বলিষ্ঠগঠন, ভারি রকমের এক ষোড়া চৌগোপ্পা আছে । গলায় যজ্ঞোপবীত । সে নিকটে আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “কি হইয়াছে ?”

  • সেই স্ত্রীলোক বলিল, “দেখিতে পাইতেছ না ?”

পুরুষ বলিল, “কিছু না । আসিতেছে কি ?” গালিচার উপর একটা ছোট দূরবীণ পড়িয়াছিল। দূরবীণ তখন ভারতবর্ষে নূতন আমদানী হইতেছিল। দূরবীণ লইয়া সুন্দরী ঐ ব্যক্তির হাতে দিল—কিছু বলিল না। সে দূরবীণ চক্ষে দিয়া নদীর সকল দিক্‌ రిg=వs চৌধুরাণী ు)S) নিরীক্ষণ করিল। শেষ এক স্থানে আর একখানি । বজরা দেখিতে পাইয়া বলিল, “দেখিয়াছি—টেকের, মাথায়—ঐ কি ?” উ। এ নদীতে আজকাল আর কোন বজরা আসিবার কথা নাই । - পুরুষ পুনৰ্ব্বার দূরবীণ দিয়া নিরীক্ষণ করিতে লাগিল । যুবতী বীণা বাজাইতে বাজাইতে বলিল, “রঙ্গরাজ ? রঙ্গরাজ উত্তর করিল, “আজ্ঞা ?” “দেখ কি ?” “কয় জন লোক আছে, তাই দেখি ” “কয় জন ?" “ঠিক ঠাওর পাই না। বেশী নয়। খুলিব ?” “খোল—ছিপ । আঁধারে আঁধারে নিঃশব্দে উজাইয়া যাও ।” তখন রঙ্গরাজ ডাকিয়া বলিল, “ছিপ খোল ।” চতুর্থ পরিচ্ছেদ পূৰ্ব্বে বলিয়াছি, বজরার কাছে তেঁতুলগাছের ছায়ায় আর একখানি নৌকা অন্ধকারে লুকাইয়াছিল। সেখানি ছিপ—ষাট হাত লম্বা, তিন হাতের বেশী চওড়া নয়। তাহাতে প্রায় পঞ্চাশ জন মানুষ গাদাগাদি হইয়া শুইয়াছিল । রঙ্গরাজের সঙ্কেত শুনিবামাত্র সেই পঞ্চাশ জন একেবারে উঠিয়া বসিল । বঁাশের চেলা তুলিয়া সকলেই এক এক গাছ। সড়কী ও এক একখানা ছোট ঢাল বাহির করিল। হাতিয়ার কেহ হাতে রাখিল না—সবাই আপনার নিকট চেলার উপরে সাজাইয়া রাখিল । রাখিয় সকলেই এক একখানা বোটে হাতে করিয়া বসিল । নিঃশব্দে ছিপ খুলিয়া, তাহার বজরায় আসিয়া লাগাইল । রঙ্গরাজ তখন নিজে পঞ্চ হাতিয়ার বাধিয়। উহার উপর উঠিল । সেই সময় যুবতী তাহাকে ডাকিয়৷ বলিল,—"রঙ্গরাজ, আগে যাহা বলিয়া দিয়াছি, মনে থাকে যেন “ “মনে আছে” বলিয়। রঙ্গরাজ ছিপে উঠিল। ছিপ নিঃশব্দে তীরে তীরে উজাইয়৷ চলিল। এ দিকে যে বজরা রঙ্গরাজ দূরবীণে দেখিয়াছিল, তাহা নদী বাহিয়া খরস্রোতে তীব্ৰবেগে আসিতেছিল । ছিপকে বড় বেশী উজাইতে হইল না । বজর নিকট হইলে, ছিপ তীর ছাড়িয়া বজরার দিকে ধাবমান হইল । পঞ্চাশ । খান বোটে, কিন্তু শব্দ নাই ! • ,