পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (তৃতীয় ভাগ).djvu/২২৮

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


૭8 এখন, বজরার ছাদের উপরে আট জন হিন্দুস্থানী রক্ষক ছিল । এত লোক সঙ্গে না করিয়া তখনকার দিনে কেহ রাত্রিকালে নৌকা খুলিতে সাহস করিত ম। আট জনের মধ্যে দুই জন হাতিয়ার-বন্ধ হইয়l, মাথায় লাল পাগড়ী বাধিয়া, ছাদের উপর বসিয়াছিল --আর ছয় জন মধুর দক্ষিণ বাতাসে চাদের আলোতে কাল দাড়ি ছড়াইয়া, সুনিদ্রায় অভিভূত ছিল । যাহারা পাহারায় ছিল, তাহাদের মধ্যে এক জন দেখিল -ছিপ বজরার দিকে আসিতেছে । সে দস্তুরমত হাকিল, “ছিপ তফাৎ " রঙ্গরাজ উত্তর করিল, “তোর দরকার হয়, তুই তফাৎ যা ” প্রহরী দেখিল, বেগোছ । ভয় দেখাইবার জন্য বন্দুকে একটা ফাক আওয়াজ করিল । রঙ্গরাজ বুঝিল, ফাক আওয়াজ । হাসিয়া বলিল, “কি পাড়ে ঠাকুর । একটা ছররাও নাই ? ধার দিব ?” এই বলিয়। রঙ্গরাজ সেই প্রহরীর মাথা লক্ষ্য করিয়া বন্দুক উঠাইল । তার পর বন্দুক নামাইয়৷ বলিল, “তোমায় এবার মারিব না । এবার তোমার লাল পাগড়ী উড়াইব ।" এই কথা বলিতে বলিতে বন্দুক রাখিয়া, তীর-ধনু লইয়া সজোরে তীর ত্যাগ করিল। প্রহরীর মাথার লাল পাগড়ী উড়িয়া গেল । প্রহরী “রাম রাম” শব্দ করিতে লাগিল । বলিতে বলিতে ছিপ আসিয়া বজরার পিছনে লাগিল । আমনি দশ বারো জন লোক ছিপ হইতে হাতিয়ার সমেত বজরার উপর উঠিয় পড়িল । যে ছয় জন হিন্দুস্থানী নিদ্রিত ছিল, তাহার বন্দুকের আওয়াজে জাগ্রত হইয়াছিল বটে, কিন্তু ঘুমের ঘোরে হাতিয়ার হাতড়াইতে তাহাদের দিন গেল । ক্ষিপ্ৰহস্তে আক্রমণকারীর। তাহাদিগকে নিমেষমধ্যে বাধিয়। ফেলিল। ষে দুই জন আগে হইতে জাগ্রত ছিল, তাহারা লড়াই করিল, কিন্তু সে অল্পক্ষণ মাত্র । আক্রমণকারীর সংখ্যায় অধিক, শীঘ্র তাহাদিগকে পরাস্ত ও নিরস্ত্র করিয়া বাধিয়া ফেলিল । তখন ছিপের লোক বজরার ভিতর প্রবেশ করিতে উদ্যত হইল । বজরার দ্বার বন্ধ ! ভিতরে ব্রজেশ্বর । তিনি শ্বশুরবাড়ী হইতে বাড়ী যাইতেছিলেন । পথে এই বিপদ। এ কেবল র্তাহার সাহসের ফল । অন্য কেহ সাহস করিয়া রাত্রে বজরা খুলিত না । রঙ্গরাজ কপাটে করাঘাত “মহাশয় দ্বার খুলুন।" করিয়া বলিল, ভিতর হইতে সদ্যোনিদ্রোখিত ব্ৰজেশ্বর উত্তর করিল, “কে ? এত গোল কিসের ?” - রঙ্গরাজ বলিল, “গোল কিছুই না—বজরায় ডাকাইত পড়িয়াছে।” ব্ৰজেশ্বর কিছুক্ষণ স্তব্ধ হইয়া পরে ডাকিতে লাগিল, “পাড়ে ! তেওয়ারি । রামসিং!” রামসিং ছাদের উপর হইতে বলিল, “ধৰ্ম্মাবতার। শালা লোক সবকোইকো বাধকে রাখখ ” ব্রজেশ্বর ঈষৎ হাসিয়া বলিল, “শুনিয়া বড় দুঃখিত হইলাম । তোমাদের মত বীরপুরুষদের ডালরুট খাইতে না দিয়া বাধিয়া ফেলিয়াছে ! ডাকাইতের এ বড় ভ্ৰম! ভাবনা করিও না-কাল ডালরুটীর বরাদ বাড়াইয়া দিব ।” শুনিয়া রঙ্গরাজও ঈষৎ হাসিল । বলিল, “আমরও সেই মত ; এখন দ্বার খুলিবেন বোধ হয় । ব্রজেশ্বর জিজ্ঞাসা করিল, “তুমি কে ?” রঙ্গরাজ ! আমি এক জন ডাকাইত মাত্র । দ্বার খোলেন, এই ভিক্ষ । “কেন দ্বার খুলিব ?” রঙ্গরাজ ! আপনার সর্বস্ব লুঠপাট করিব । ব্ৰঞ্জেশ্বর বলিল, “কেন ? অামাকে কি হিন্দুস্থানী ভেড়ীওয়াল পাইলে ? আমার হাতে দোনলা বন্দুক আছে—তৈয়ার । ষে প্রথম কামরায় প্রবেশ করিবে, নিশ্চয় তাহার প্রাণ লইব ।” রঙ্গরাজ ! এক জন প্রবেশ করিব না, কয় জনকে মারিবেন ? আপনিও ব্রাহ্মণ, আমিও ব্রাহ্মণ । এক তরফ ব্রহ্মহত্য হইবে, মিছামিছি ব্ৰহ্মহত্যায় কাজ কি ? ব্রজেশ্বর বলিল, “সে পাপট না হয় আমিই স্বীকার করিব।” এই কথা ফুরাইতে ন ফুরাইতে মড়মড় শব্দ হইল । বজরার পাশের দিকের একখানা কপাট ভাঙ্গিয়া, এক জন ডাকাইত কামরার ভিতর প্রবেশ করিল দেখিয়া, ব্রজেশ্বর হাতের বন্দুক ফিরাইয় তাহার মাথায় মারিল। দস্থ্য মূচ্ছিত হইয়া পড়িল। এই সময়েই রঙ্গরাজ বাহিরের কপাটে জোরে দুইবার পদাঘাত করিল। কপাট ভাঙ্গিয়া গেল । রঙ্গরাজ কামরার ভিতর প্রবেশ করিল। ব্রজেশ্বর আবার বন্দুক ফির+ ইয়া ধরিয়া রঙ্গরাজকে লক্ষ্য করিতেছিলেন, এমন সময় রঙ্গরাজ র্তাহার হাত হইতে বন্দুক কাড়িয়া লইল । দুই জনেই তুল্য বলশালী, তবে রঙ্গরাজ অধিকতর ক্ষিপ্ৰহস্ত। ব্রজেশ্বর তখন দৃঢ়তর মুষ্টিবদ্ধ করিয়া সমুদায় বলের সহিত রঙ্গরাজের মাথায়