পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (তৃতীয় ভাগ).djvu/২৫৬

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


৬২ নহে । যে উহাকে দেবী বলিয়া পরিচয় দিতেছে, সে রাণীজিকে মা বলে, রাণীজিকে মা'র মত ভক্তি করে, এই জন্য সে রাণীজিকে বাচাইবার জন্য অন্ত ব্যক্তিকে নিশান দিতেছে। তখন সাহেব দেবীকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “দেবী তবে কে ?” দেধী বলিল, “আমি দেবী " দেবী এই কথা বলিলে, নিশিতে, দিবাতে, রঙ্গরজে ও দেবীতে বড় গণ্ডগোল বাধিয়া গেল । নিশি বলে, “আমি দেবী", দিবা বলে, “আমি দেবী ।” রঙ্গরাজ নিশিকে বলে, “এই দেধী”, দেবী বলে, “আমি দেবী।” বড় গোলমাল । তখন লেফটেনাণ্ট সাহেব মনে করিলেন, এ ফেরেববাজির একটা চুড়ান্ত করা উচিত । বলিলেন, “তোমাদের দুই জনের মধ্যে এক জন দেবী রাণী বটে। ওটা চাকরাণী, ওটা দেবী নহে । এই দুই জনের মধ্যে কে সে পাপিষ্ঠ, তাহা তোমরা চাতুরী করিয়া আমাকে জানিতে দিতেছ না, কিন্তু তাহাতে তোমাদের অভিপ্রায় সিদ্ধ হইবে না। আমি এখন কুই জনকেই ধরিয়া লইয়া যাইব । ইহার পর প্রমণের দ্বারা যে দেবী চৌধুরাণী বলিয়া সাব্যস্ত হইবে, সেই ফঁাসি যাইবে । যদি প্রমাণের দ্বারা এ কথ। পরিস্কার না হয়, তবে দুই জনেই ফঁাসি যাইবে ।" তখন নিশি ও দিবা দুই জনেই বলিল, “এত গোলযোগে কাজ কি ? আপনার সঙ্গে কি গোইদি নাই ? যদি গোইন থাকে, তবে তাহাকে ডাক - ইলেই ত সে বলির দিতে পারিবে,-কে যথার্থ দেবী চৌধুরাণী * - ইরুবল্লভকে বজরায় আনিবে, দেবার এই প্রধান উদেষ্ঠ । হরবল্লভের রক্ষার ব্যপস্ত না করিয়া দেবী আত্মরক্ষার উপায় করিবে না, ইহা স্থির । তাহাকে বজরায় না আনিতে পারিলে হরবল্লভের রক্ষার নিশ্চয়ত হয় না | সাহেব মনে করিলেন, “এ পর্যনর্শ মন্দ নহে ।” তখন তাহার সঙ্গে যে সিপাহী আসিয়াছিল, তাহাকে বলিলেন, “গেইন্দাকে ডাক ” সিপাহী এক ছিপের এক জন জমাদার সাহেবকে ডাকিয়া বলিল, "গেইন্দাকে ডাক ।” তখন গোইনদীকে ডাকাডাকির গোল পড়িয়া গেল । গেইন্দা কোথায়, গোইনদী কে, তাহ কেহই জানে না, কেবল চারিদিকে ডাকাডাকি করে } বঙ্কিমচন্দ্রের গ্রন্থাবলী . সপ্তম পরিচ্ছেদ বস্তুতঃ হরবল্লভ রায় মহাশয় যুদ্ধক্ষেত্রেই উপস্থিত ছিলেন, কিন্তু সে ইচ্ছাপূৰ্ব্বক নহে, ঘটনাধীন। প্রথমে বড় ঘেসেন নাই, “শৃঙ্গীণাং শস্ত্রপাণিনামূ” ইত্যাদি চাণক্যপ্রদত্ত সুস্থাপদেশ স্মরণ করিয়া তিনি সিপাহীদিগের ছিপে উঠেন নাই ! একখানা পৃথক্ ডিঙ্গীতে থাকিয়া লেফটেনাণ্ট সাহেবকে বজরা দেখাইয়া দিয়া অৰ্দ্ধক্রোশ দূরে পলাইয়া গিয়া ডিঙ্গী ও প্রাণ রক্ষা করিয়াছিলেন। তার পর দেখিলেন, আকাশে বড় ঘনঘটা । মনে করিলেন, ঝড় উঠবে ও এখনই আমার ডিঙ্গা ডুবির যাইবে, টাকার লোভে আসিয়া আমি প্রাণ হারাইব, আমার সৎকারও হুইবে না। তখন রায় মহাশয় ডিঙ্গী হইতে তীরে অবতরণ করিলেন । , কিন্তু তীরে সেখানে কেত কোথাও নাই দেখিয়া বড় ভস্তু হইল। সাপের ভয়, বাঘের ভয়, চোর ডাকাইতের ভয়, ভূতেরও ভয় ; হরবল্লভের মনে হুইল, কেন এমন ঝকৃমারি করিতে আসিয়াছিলাম। হরবল্লভের কান্না আসিল । এমন সময়ে হঠাৎ বন্দুকের হুড়মুড়ি, সিপাহী বরকন্দাজের হৈ হৈ শব্দ সব বন্ধ ইষ্টয়া গেল। হরবল্পভের বোপ হইল, অবশু সিপাহীর জয় হইয়াছে, ডাকাইত মাগী ধরা পড়িয়ছে, নহিলে লড়াই বন্ধ হইবে কেন ? তখন হরবল্লভ ভরসা পাষ্টয়া যুদ্ধস্তানে যাইতে অগ্রসর হইলেন । তবে এ রাত্রিকালে, এ অন্ধকারে এ বনজঙ্গলের মাঝে অগ্রসর হন কিরূপে ? ডিঙ্গার মাঝিকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “ঙ্গ বাপু মাঝি—বলি, ওদিকে নওয়৷ সায় কিরূপে, বলিতে পার ?” মাঝি বলিল, “যাওয়ার ভাবনা কি ? ৬িঙ্গীতে উঠন না, নিয়ে যাচ্ছি। সিপাহীরা মার্বে ধরবে না ত ? আবার যদি লড়াই বাপে ?" হর । সিপাহার। আমাদের কিছু বলিবে না। লড়াই আর বাধিবে না—ডাকাঠত ধরা পড়েছে। কিন্তু যে রকম মেঘ করিয়াছে, এখনই ঝড় উঠবে— · ডিঙ্গীতে উঠিব কিরূপে ? মাঝি বলিল, “ঝড়ে ডিঙ্গ কখন ডোবে না ।" হরুবল্লভ প্রথমে সে সকল কথায় বিশ্বাস করিলেন - ন-শেষে অগত্যা ডিঙ্গীতে উঠিলেন। মাঝিকে , উপদেশ দিলেন, “কেনারায় কেনারায় ডিঙ্গী লইয়া যাইবে।” মাঝি তাহাই করিল। শীঘ্ৰ আসিয়া ডিঙ্গী বজরায় লাগিল । হরবল্লভ সিপাহীদের সঙ্কেতবাক্য জানিতেন, সুতরাং সিপাহীরা আপত্তি করিল না।