পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (তৃতীয় ভাগ).djvu/২৬৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


দেবী চৌধুরাণী নিশি । চেন না ? তার নাম প্রফুল্ল । ব্রজ । ওহো বুঝিয়াছি, কি রকমে এ সম্বন্ধে কৰ্ত্তাকে রাজি করিলে ? নিশি । মেয়েমানুষের অনেক রকম আছে। ছোট বোনের শাশুড়ী হইতে নাই—নহিলে আরও একটা সম্বন্ধে তাহাকে রাজি করিতে পারিতাম । দিব রাগিয়া উঠিল ; বলিল, “তুমি শীগগির মর ; লজ্জাসরম কি কিছুই নাই ? পুরুষমানুষের সঙ্গে কি আমন ক'রে কথা কইতে হয় ?” নিশি। কে আবার পুরুষমানুষ ? কা’ল দেখা গিয়াছে, কে পুরুষ কে মেয়ে ! ত্র। আজিও দেখিবে । তুমি মেয়েমানুষ, মেয়েমানুষের মত মোটা বুদ্ধির কাজ করিয়াছ । কাজটা ভাল হয় নাই । নিশি । সে আবার কি ? ব্র । বাপের সঙ্গে কি প্রবঞ্চন চলে ? বাপের চোখে ধূলা দিয়া মিছে কথা বহাল রাখিয়া আমি স্ত্রী লইয়া সংসার করিব ? যদি বাপকে ঠকাইলাম, তবে পৃথিবীতে কার কাছে জুয়াচুরী করিতে আমার আটকাইবে ? নিশি অপ্রতিভ হইল, মনে মনে স্বীকার করিল, ব্ৰজেশ্বর পুরুষ বটে, কেবল লাঠিবাজীতে পুরুষ হয় না ; নিশি তা বুঝিল । বলিল, “এখন উপায় ?” ব্র । উপায় আছে। চল, প্রফুল্লকে লইয়। ঘরে যাই, সেখানে গিয়া বাপকে সকল কথা ভাঙ্গিয়া বলিব । ব্ৰঞ্জেশ্বর ? লুকাচুরি হইবে না। নিশি । তা হইলে তোমার বাপ কি দেবী চৌধুরাণীকে বাড়ীতে উঠিতে দিবেন ? দেবী বলিল, “দেবী চৌধুরাণী কে ? দেবী চৌধুরাণী মরিয়াছে, তার নাম এ পৃথিবীতে মুখেও আনিও না । প্রফুল্লের কথা বল।” নিশি । প্রফুল্লকেই কি তিনি ধরে স্থান দিবেন ? ব্র । আমি ত বলিয়াছি যে, সে ভার আমার । প্রফুল সন্তুষ্ট হইল। বুঝিয়াছি যে, ব্রজেশ্বরের ভার বহিবার ক্ষমতা না থাকিলে সে ভার লইবার লোক নহে । ssssssts=* একাদশ পরিচ্ছেদ তখন ভূতনাথ যাইবার উদ্যোগ আরম্ভ হইল । রঙ্গরাজকে সেইখান হইতে বিদায় দিবার কথা স্থির হইল। কেন না, ব্রজেশ্বরের দ্বারবানেরা এক দিন Jసి তাহার লাঠি খাইয়াছিল , যদি দেখিতে পায়, তবে চিনিবে । রঙ্গরাজকে ডাকিয়া সকল কথা বুঝাইয়া দেওয়া হইল, কতক নিশি বুঝাইল, কতক প্রফুল নিজে বুঝাইল । রঙ্গরাজ কঁদিল—বলিল, “ম, আমাদিগকে ত্যাগ করিরেন, তা ত কখনও জানিতাম না।* সকলে মিলিয়া রঙ্গরাজকে সাস্তুনা করিল। দেবীগড়ে প্রফুল্লের ঘর-বাড়ী দেবসেবা, দেবত্র সম্পত্তি ছিল । সে সকল প্রফুল্ল রঙ্গরাজকে দিলেন ; বলিলেন, “সেইখানে গিয়া বাস কর । দেবতার ভোগ হয়, প্রসাদ খাইয়া দিনপাত করিও । আর কখনও লাঠি ধরিও না । তোমরা যাকে পরোপকার বল, সে বস্তুতঃ পরপীড়ন । ঠেঙ্গালাঠি দ্বারা পরোপকার হয় না । দুষ্টের দমন রাজা না করেন, ঈশ্বর করিবেন। তুমি আমি কে ? শিষ্টের পালনের ভার লইও, কিন্তু দুষ্টের দমনের ভার ঈশ্বরের উপর রাখিও। এই সকল কথাগুলি আমার পক্ষ হইতে ভবানী ঠাকুরকেও বলিও । তাকে আমার কোটি কোটি প্রণাম জানাইও ” রঙ্গরাজ কঁাদিতে কঁাদিতে বিদায় লইল । দিব৷ ও নিশি সঙ্গে সঙ্গে ভূতনাথের ঘাট পৰ্য্যস্ত চলিল । সেই বজরায় ফিরিয়া তাহারা দেবীগড়ে গিয়া বাস করিবে, প্রসাদ খাইবে, আর হরিনাম করিবে । বজরায় দেবীর রাণীগিরির আসবাব সব ছিল, পাঠক দেখিয়াছেন, তাহার মূল্য অনেক টাকা। প্রফুল্ল সব দিবা ও নিশিকে দিলেন। বলিলেন, “এ সকল বেচিয়৷ যাহা হইবে, তাহার মধ্যে তোমাদের যাহা প্রয়োজন, ব্যয় করিবে । বাকী দরিদ্রকে দিবে । এ সকল আমার কিছুই নয় —আমি ইহার কিছুই লইব ন৷ ” এই বলিয়া প্রফুল্ল আপনার বহুমূল্য বস্ত্রীলঙ্কারগুলি নিশি ও দিবাকে দিলেন । নিশি বলিল, “মা । উঠিবে ?” প্রফুল্ল ব্রজেশ্বরকে দেখাইয় দিয়া বলিল, “স্ত্রীলোকের এই আভরণ সকলের ভাল । আর আভরণে কাজ কি মা ?” - নিশি বলিল, “আজ তুমি প্রথম শ্বশুরবাড়ী যাইতেছ , আমি আজ তোমাকে কিছু যৌতুক দিয়া আশীৰ্ব্বাদ করিব। তুনি মানা করিও না, এই আমার শেষের সাধ—সাধ মিটাইতে দাও ” এই বলিয়া নিশি কতকগুলি বহুমূল্য রত্নালঙ্কারে প্রফুল্পকে সাজাইতে লাগিল । পাঠকের স্মরণ থাকিতে পারে, নিশি যখন এক রাজমহিষীর কাছে থাকিত, রাজমহিষী তাহাকে অনেক অলঙ্কার দিয়াছিলেন । এই নিরাভরণে শ্বশুরবাড়ী