পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (তৃতীয় ভাগ).djvu/২৬৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


দেবী চৌধুরাণী १: মেয়ে বিয়ে করিয়াছিল, হরি চাটুষ্যে সত্তর বৎসরের একটা কুমারী ঘরে আনিয়াছিলেন, মন্ত্র বাড়ুৰ্য্যে একটি প্রাচীনার অন্তর্জলে তাহার পাণিগ্রহণ করিয়াছিলেন, এই সকল আখ্যায়িকা সালঙ্কারে পথিমধ্যে ব্যাখ্যাত হইতে লাগিল। এইরূপ আন্দোলন করিয়া ক্রমে গ্রাম ঠাণ্ড হইল । গোলমাল মিটিয়৷ গেল। গিল্পী বিরলে ব্রজেশ্বরকে ডাকিলেন । ব্ৰজ আসিয়া বলিল, “কি মা ?” গিল্পী । বাবা, এ বউ কোথা পেলে, বাবা ? ব্রজ। এ নুতন বিয়ে নয় মা । গিল্পী । বাবা, এ হারাধন আবার কোথ। পেলে বাবা ? গিল্পীর চোখে জল পড়িতেছিল । ব্রজ । মা, বিধাতা দয়া করিয়! আবার দিয়াছেন, এখন মা, তুমি বাবাকে কিছু বলিও না। নির্জন পাইলে আমি সকলই তার সাক্ষাতে প্রকাশ করিব । গিন্নী । তোমাকে কিছু বলিতে হইবে না বাপ, আমিই সব বলিব । বউ-ভাতটা হইয়া যাক্ ; তুমি কিছু ভাবিও না। এখন কাহারও কাছে কিছু বলিও নী ৷ ব্ৰজেশ্বর স্বীকৃত হুইল । এ কঠিন কাজের ভার মা লইলেন। ব্রজ বাচিল । কাহাকে কিছু বলিল না । পাকস্পর্শ নিৰ্ব্বিল্পে হইয়া গেল । বড় ঘটাপট কিছু হইল না, কেবল জনকতক আত্মীয়-স্বজন ও কুটুম্ব নিমন্ত্রণ করিয়া হরবল্লভ কাৰ্য্য সমাধা করিলেন । পাকম্পর্শের পর গিল্পী আসল কথাট। হরবল্লভকে ভাঙ্গিয়া বলিলেন। বলিলেন যে,—“এ নূতন বিয়ে ন –সেই বড় বউ ” হরবল্লভ চমকিয়া উঠিল—সুপ্ত ব্যাঘ্রকে কে যেন বাণে বিধিল । “আঁ্যা । সেই বড় বউ—কে বল্লে ?” গিল্পী। অামি চিনেছি ! অীর ব্রজও আমাকে বলিয়াছে। হর। সে যে দশ বৎসর হলো ম'রে গেছে । গিল্পী। মরা মানুষে কখনও ফিরে থাকে ? হর। এত দিন সে মেয়ে কোথায় কার কাছে এছল ?

গিল্পী । তা আমি ব্ৰজেশ্বরকে জিজ্ঞাসা করি নাই, জিজ্ঞাসাও করিব না । ব্রজ যখন ঘরে আনিয়াছে, তখন না বুঝিয়া মুঝিয়া আনে নাই ।

হর । আমি জিজ্ঞাসা করিতেছি । গিল্পী। অামার মাথা খাও, তুমি একটি কথাও কহিও না । তুমি একবার কথা কহিয়াছিলে, তার ফলে আমার ছেলে আমি হারাইতে বসিয়াছিলাম । আমার একটি ছেলে । আমার মাথা খাও, ধু একটি কথাও কহিও না। যদি তুমি কোন ৰ' কহিবে, তবে আমি গলায় দড়ি দিব । গ্রন্থ হরবল্লভ এতটুকু হইয়া গেলেন। একটি কথাগু? কহিলেন না। কেবল বলিলেন, “তবে লোকের কাছে নূতন বিয়ের কথাটাই প্রচার থাক।” গিল্পী বলিলেন, “তাই থাকিবে ।" সময়াস্তরে গিল্পী ব্রজেশ্বরকে সুসংবাদ জানাইলেন ; বলিলেন, “আমি তাকে বলিয়াছিলাম। তিনি কোন কথা কহিবেন না। সে সব কথার আর কোন উচ্চবাচ্যে কাজ নাই ।” ব্রজ হৃষ্টচিত্তে প্রফুল্লকে খবর দিল । ૬ઠ્ઠર আমরা স্বীকার করি, গিরী এবার বড় গিল্পীপনা করিয়াছেন । যে সংসারের গিল্পী গিন্নীপনা জানে, সে ংসারে কাহারও মনঃপীড়া থাকে না। মাঝিতে হাল ধরিতে জানিলে নৌকার ভয় কি ? ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ প্রফুল্ল সাগরকে দেখিতে চাহিল। ব্রজেশ্বরের ইঙ্গিত পাইরা গিল্পী সাগরকে আনিতে পাঠাইলেন । গিয়ীরও সাধ, তিনটি বউ একত্র করেন। ’ যে লোক সাগরকে আনিতে গিয়াছিল, তাহার মুখে সাগর শুনিল, স্বামী আর একটা বিবাহ করিয়া আনিয়াছেন—বুড়ে মেয়ে ! সাগরের বড় ঘুণ হইল । “ছি ! বুড়ে মেয়ে ” সাগরের বড় রাগ হইল, “অtবার বিয়ে ? আমরা কি স্ত্রী নই?” দুঃখ হইল, “হায় ! বিধাতা কেন অামায় দুঃখীর মেয়ে করেন নাই ? অামি কাছে থাকিতে পারিলে, তিনি হয় ত আর বিয়ে করিতেন না ।” এইরূপ রুষ্ট ও ক্ষুণ্ণভাবে সাগর শ্বশুরবাড়ী আসিল । আসিয়াই প্রথমে নয়ান-বউয়ের কাছে গেল । নয়ান বউ সাগরের দুই চক্ষের বিষ ; সাগর বউ নয়নেরও তাই । কিন্তু আজি দুই জনে এক, দুই জনের এক বিপদ। তাই ভাবিয়া, সাগর আগে নয়ন তারার কাছে গেল । সাপকে হাড়ির ভিতর পূরিলে যেমন গর্জিতে থাকে, প্রফুল্ল আসা অবধি নয়নতারা সেইরূপ করিতেছিল। একবারমাত্র ব্ৰজেশ্বরের সঙ্গে সাক্ষাৎ হইয়াছিল— গালির চোটে ব্রজেশ্বর পলাইল ; আর আসিল না । প্রফুল্লও ভাব করিতে গিয়াছিল, কিন্তু তারও সেই দশা ঘটিল। স্বামী সপত্নী দূরে থাক, পাড়াপ্রতিবাসীও