পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (তৃতীয় ভাগ).djvu/২৯

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


অনিন্দমঠ তার গালে এক চড় মারিল—সে নিমাইয়ের কাধে হাত দিয়া তাহাকে কুটরের বাহির করিল। বলিল, “চল, এই দ্যাকড়া পরিয়া তাহাকে দেখিয়! আসি ।” কিছুতেই কাপড় বদলাইল না। অগত্য নিমাই রাজি হইল। নিমাই তাহাকে সঙ্গে লইয়া আপনার বাড়ীর দ্বার পর্য্যন্ত গেল, গিয়া তাহাকে ভিতরে প্রবেশ করাইয়া দ্বার রুদ্ধ করিয়! আপনি দ্বারে দাড়াইয়া রহিল । ষোড়শ পরিচ্ছেদ সে স্ত্রীলোকের বয়স প্রায় পচিশ বৎসর, কিন্তু দেখিলে নিমাইয়ের অপেক্ষ অধিক বয়স্ক বলিয়। বোধ হয় না । মলিন গ্রন্থিযুক্ত বসন পরিয়া সেই গৃহমধ্যে প্রবেশ করিল, বোধ হইল, যেন গৃঙ্গ আলে৷ হইল । বোধ হইল, পাতায় ঢাক কোন গাছে কত ফুলের কুঁড়ি ছিল, হঠাৎ ফুটিয়া উঠিল ; বোপ হইল যেন, কোথাও গোলাপ জলের কার্ল মুখ আঁটা ছিল, কে কাৰ্ব্ব ভাঙ্গিন। ফেলিল ; সেন কে প্রাসু নিবাল আগুনে ধূপ-ধূন গুগুল ফেলিয়। দিল, সে রূপসী গৃহমধ্যে প্রবেশ করিয়া ইতস্ততঃ স্বামীর অন্বেষণ করিতে লাগিল—প্রথমে ত দেখিতে পাইল ন! । তার পর দেখিল, গুহুপ্রাঙ্গণে একটি ক্ষুদ্র আম্রবৃক্ষ আছে, আমের কাণ্ডে মাথ রাখি জীবানন্দ কঁদিতেছেন । সেই রূপসী ঠাহীর নিকটে গিয়। ধীরে ধীরে তাহার হস্ত ধারণ করিল । বলি না যে, তাহার চক্ষে জল আসিল না । জগদীশ্বর জানেন যে, তাহার চক্ষে যে স্রোতঃ আসিয়াছিল, বহিলে তাহা জীবানন্দকে ভাসাঈয়। দিত, কিন্তু সে তাহ বহিতে দিল না ; জীবানন্দের হাত হাতে লইয়। বলিল, “ছি, কঁাদিও না, আমি জানি, তুমি আমার জন্য কাদিতেছ, আমার জন্য তুমি কাদিও ন—তুমি যে প্রকারে আমাকে রাখিয়াছ, আমি তাঁহাতেই সুখী |" জীবানন্দ মাথা তুলিয়া, চক্ষু মুছিয়া স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “শাস্তি ! তোমার এ শতগ্রন্থি মলিন বস্ত্র কেন ? তোমার ত খাইবার পরিবার अऊांत नाँझे ।” শাস্তি বলিল, “তোমার ধন তোমারই জন্য আছে । আমি টাকা লইয়া কি করিতে হয়, তাহা জানি না । যখন তুমি আসিবে, যখন তুমি আমাকে গ্রহণ জীব । গ্রহণ করিব—শাস্তি! আমি কি তোমায় ত্যাগ করিয়াছি ? - ఫ్చిక , শান্তি । ত্যাগ নহে—যবে তোমার ব্ৰত সাঙ্গ হইবে, যবে আবার আমায় ভালবাসিবে— কথা শেষ ন হইতেই জীবানন্দ শাস্তিকে গাঢ় আলিঙ্গন করিয়া, তাহার কাধে মাথা রাখিয়া, অনেকক্ষণ নীরব হইয়া রহিলেন । দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া শেষে বলিলেন, “কেন দেখা করিলাম ?” শান্তি । কেন করিলে—তোমার ত ব্ৰতভঙ্গ করিলে ? জীব। এতভঙ্গ হউক –প্রায়শ্চিত্ত আছে । তাহার জন্য ভাবি না ; কিন্তু তোমায় দেখিয়া ত আর ফিরিয়া যাইতে পারিতেছি না। আমি এই জন্ত নিমাইকে বলিয়াছিলাম যে, দেখায় কাজ নাই, তোমার দেখিলে আমি ফিরিতে পারি না । এক দিকে ধৰ্ম্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষ, জগৎসংসার ; এক দিকে ব্রত, হোম, যাগযজ্ঞ ; সবই এক দিকে, আর একদিকে তুমি । আমি সকল সময় বুঝিতে পারি না যে, কোন দিক্‌ ভারি হয় । দেশ ত শাস্ত, দেশ লইয়া আমি কি করিব ? দেশের এক কাঠা ভূই পেলে তোমায় লইয়। আমি স্বৰ্গ প্রস্তুত করিতে পারি, আমার দেশে কাজ কি ? দেশের লোকের দুঃখ– যে তোমা হেন স্ত্রী পাইক্স ত্যাগ করিল—তাহ। অপেক্ষ দেশে আর কে দুঃখী আছে ? যে তোমার অঙ্গে শতগ্রন্তি-বস্ত্র দেখিল, তাহার অপেক্ষ দরিদ্র দেশে আর কে আছে ? অামার সকল ধৰ্ম্মের সহায় তুমি । সে সহায় যে ত্যাগ করিল, তার কাছে আবার সনাতন ধৰ্ম্ম কি ? আমি কোন ধৰ্ম্মের জন্য দেশে দেশে, বনে বনে, বন্দুক ঘাড়ে করিয়া, প্রাণিহত্যা করিয়া, এই পাপের ভার সংগ্ৰহ করি ? পৃথিবী সস্তানদের আয়ত্ত হইবে কি না, জানি না ; কিন্তু তুমি আমার আয়ত্ত, তুমি পৃথিবী আপেক্ষ বড়, তুমি আমার স্বৰ্গ । চল গৃহে যাই--আর আমি ফিরিব না । শাস্তি কিছু কাল কথা কহিতে পারিল না। তার পর বলিল, “ছি –তুমি বীর । আমার পৃথিবীতে বড় মুখ যে, আমি বীরপত্নী । তুমি অধম স্ত্রীর জন্য বীরধৰ্ম্ম ত্যাগ করিবে ? তুমি আমায় ভালবাসিও না --আমি সে সুখ চাহি না—কিন্তু তুমি তোমার বীরধৰ্ম্ম কখনও ত্যাগ করিও না । দেখ, আমাকে একট। কথা বলিয়া যাও—এ ব্ৰতভঙ্গের প্রায়শ্চিত্ত কি ?” জীবানন্দ বলিলেন, “প্রায়শ্চিত্ত—দান—উপবাস —১২ কাহন কড়ি " শাস্তি ঈষৎ হাসিল । বলিল, “প্রায়শ্চিত্ত কি, তা আমি জানি । এক অপরাধে যে প্রায়শ্চিত্ত— শত অপরাধেও কি তাই ?”