পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (তৃতীয় ভাগ).djvu/৩০

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


:.২৮

  1. , *3.

যাইবে ? জীবানন্দ বিস্মিত ও বিষণ্ণ হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “এ সকল কথা কেন ?” শাস্তি । এক ভিক্ষা আছে । আমার সঙ্গে আবার দেখা ন হইলে প্রায়শ্চিত্ত করিও না । জীবানন্দ তখন হাসিয়া বলিলেন, “সে বিষয়ে নিশ্চিস্ত থাকিও । তোমাকে না দেখিয়! আমি মরিব না । মরিবার তত তাড়াতাড়ি নাই । আর আমি এখানে থাকিব না, কিন্তু চোখ ভরিয়! তোমাকে দেখিতে পাইলাম না, এক দিন অবশ্ব সে দেখা দেখিব, এক দিন অবশু আমাদের মনস্কামন সফল হইবে । আমি এখন চলিলাম, তুমি আমার এক অমুরোধ রক্ষা করিও । এ বেশভূষা ত্যাগ কর । আমার পৈতৃক ভিটায় গিয়া বাস কর ।” শাস্তি জিজ্ঞাসা করিল, “তুমি এখন কোথায় জীব । এখন মঠে এহ্মচারীর অতুসন্ধানে যাইব । তিনি যে ভাবে নগরে গিয়াছেন, তাহাতে কিছু চিন্তাযুক্ত হইয়াছি, দেউলে তাহার সন্ধান না পাই, নগরে যাইব । ssam: সপ্তদশ পরিচ্ছেদ ভবানন্দ মঠের ভিতর বসিয়! হরিগুণ গান করিতেছিলেন, এমন সময়ে বিমঃমুখে জ্ঞানানন্দনাম এক জন তেজস্বী সন্তান তাহার কাছে আসিয়৷ উপস্থিত হইলেন । ভবানন্দ বলিলেন, “গোসাই, মুখ অত ভারি কেন ?" জ্ঞানানন্দ বলিলেন, “কিছু গোলযোগ বোধ হইতেছে। কালিকার কাণ্ডটার জন্য নেড়ের গেরুয়া কাপড় দেখিতেছে, আর ধরিতেছে । অপরাপর সম্ভানগণ আজ সকলেই গৈরিক বসন ত্যাগ করিয়াছে । কেবল সত্যানন্দ প্রভু গেরুয়া পরিয়া এক নগরী ভিমুখে গিয়াছেন । কি জানি, সদি তিনি মুসলমানের হাতে পড়েন ।” ভবানন্দ বলিলেন, “তাইকে আটক রাখে, এমন মুসলমান বাঙ্গালায় নাই । ধারানন্দ তাঙ্গর পশ্চাদ গামী হুইয়াছেন জানি । তথাপি আমি একবার নগর বেড়াইয়া আসি, তুমি মঠ রক্ষা করিও ।” এই বলিয়া ভবানন্দ এক নিভৃত কক্ষে গিয়া একটা বড় সিন্দুক হইতে কতকগুলি বস্ত্র বাহির করিলেন । সহসা ভবানন্দের রূপান্তর হইল, গেরুর বসনের পরিবর্তে চুড়িদার পায়জামা, মেরজাই, কাবা, মাথায় আমামা এবং পায়ে নাগরা শোভিত হইল । বঙ্কিমচন্দ্রের গ্রন্থাবলী মুখ হইতে ত্রিপুণ্ডাদি চন্দনচিহ্ন সকল বিলুপ্ত করিলেন । ভ্রমরকৃষ্ণ গুম্ফশশুশোভিত সুন্দর মুখমণ্ডল অপূৰ্ব্ব শোভা পাইল । তৎকালে উহাকে দেখিয়া মোগলজাতীয় যুদ্ধ পুরুষ বলিয়া বোধ হইতে লাগিল । ভবানন্দ এইরূপে মোগল সাজিয়া সশস্ত্র হইয়া মঠ হইতে নিক্রিান্ত হইলেন। সেখান হইতে ক্রোশৈক দূরে দুইটি অতি অনুচ্চ পাহাড় ছিল। সেই পাহাড়ের উপর জঙ্গল উঠিয়াছে । সেই দুইটি পাহাড়ের মধ্যে একটি নিভৃত স্থান ছিল, তথায় অনেকগুলি অশ্ব রক্ষিত হইয়াছিল। মঠবাসীদিগের অশ্বশাল এইখানে ; ভবানন্দ তাহার মধ্য হইতে একটি অশ্ব উন্মোচন করিয়া তৎপুষ্ঠে আরোহণ পূৰ্ব্বক নগরাভিমুখে ধাবমান হইলেন । যাইতে যাইতে সহসা তাহার গতিরোধ হইল । সেই পথিপার্থে কলনদিনী তরঙ্গিণীর কুলে গগনস্ৰষ্ট নক্ষত্রের ন্যায়, কাদম্বিনীচুত বিদ্যুতের ন্যায় দীপ্ত স্ত্রীমূৰ্ত্তি শয়ান দেখিলেন। দেখিলেন, জীবলক্ষণ কিছুই নাই—শূন্য বিষের কোঁটা পড়িয়া আছে। ভবা নন বিষ্মিত, ক্ষুব্ধ, ভীত হইলেন । জীবানন্দের ন্যায় ভবানন্দও মহেদের স্ত্রী-কন্তকে দেখেন নাই । জীবানন্দ যে সকল কারণে সন্দেহ করিয়াছিলেন যে, এ মহেন্দ্রের স্ত্রী কণ্ঠ হইতে পারে, ভবানন্দের কাছে সে সকল কারণ অনুপস্থিত । তিনি ব্রহ্মচারী ও মহেন্দ্রকে বন্দিভাবে নীত হইতে দেখেন নাই—কাটিও সেখানে নাই ; কৌটা দেখিয়া বুঝিলেন, কোন স্ত্রী লোক বিধ খাইয়। মরিয়াছে । ভবানন্দ সেই শবের নিকট বসিলেন ; বসিয়া কপোলে কর লগ্ন করিয়া অনেক ক্ষণ ভাবিলেন । মাথায়, বগলে, হাতে, পাশে হাত দিয়া দেখিলেন ; অনেক প্রকার অপরের অপরিজ্ঞাত পরীক্ষা করিলেন ; তখন মনে মনে বলিলেন, “এখনও সময় অাছে কিন্তু বাচাইয়া কি করিব ?" এইরূপ ভবানন্দ অনেকক্ষণ চিন্তা করিলেন, চিন্তা করিয়া বনমধ্যে প্রবেশ করিয়া একটি বৃক্ষের কতকগুলি পাত লষ্টয়া আসিলেন । পাতাগুলি হাতে পিষিয় রস করিয়ু সেই রস শবের ওষ্ঠ দস্তু ভেদ করিয়া অঙ্গুলি দ্বারা কিছু মুখে প্রবেশ করাইয়। দিলেন । পরে নাসিকায় কিছু কিছু রস দিলেন--অঙ্গে সেই রস মাখাইতে লাগিলেন । পুনঃ পুনঃ এইরূপ করিতে লাগিলেন, মধ্যে মধ্যে নাকের কাছে হাত দিয়া দেখিতে লাগিলেন যে, নিশ্বাস বহিতেছে কি না। বোধ হইল, যেন যত্ন বিফল হইতেছে । এইরূপ বহুক্ষণ পরীক্ষা করিতে করিতে ভবানন্দের মুখ কিছু প্রফুল্প হইল—অঙ্গুলিতে নিশ্বাসের