পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (তৃতীয় ভাগ).djvu/৩৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


ভিক্ষা করিয়া খাইয়৷ জগন্নাথক্ষেত্রের রাস্তায় গিয়া দাড়াইল । অল্পকালেই সেই পথে এক দল সন্ন্যাসী দেখা দিল। শান্তি তাঁহাদের সঙ্গে মিশিল । তখন সন্ন্যাসীরা এখনকার সন্ন্যাসীদের মত ছিল না। তাহারা দলবদ্ধ, সুশিক্ষিত, বলিষ্ঠ, যুদ্ধবিশারদ এবং অন্যান্য গুণে গুণবান ছিল । তাহারা সচরাচর একপ্রকার রাজবিদ্রোহী—রাজার রাজস্ব লুঠিয়৷ থাইত । বলিষ্ঠ বালক পাইলেই তাহার। অপহরণ করিত, তাহাদিগকে সুশিক্ষিত করিয়া আপনাদিগের সম্প্রদায়ভুক্ত করিত। এজন্য তাহাদিগকে ছেলেধরা বলিত । শাস্তি বালকসন্ন্যাসিবেশে ইহাদের এক সম্প্রদায়মধ্যে মিশিল । তাহারা প্রথমে তাহাব কোমলাঙ্গ দেখিয় তাহাকে গ্রহণ করিতে ইচ্ছক ছিল না, কিন্তু শান্তির বৃদ্ধির প্রাথর্য্য, চতুরতা এবং কৰ্ম্মদক্ষত। দেখিয়া আদর করিয়া দলে লইল । শান্তি তাহাদিগের দলে থাকিয়া বায়াম করিত, অস্ত্রশিক্ষা করিত এবং পরিশ্রমসহিষ্ণু শ্লষ্টয়া উঠিল । তাহাদের সঙ্গে থাকিয়৷ অনেক দেশ-বিদেশ পর্যটন করিল, অনেক লড়াই দেখিল এবং অস্ত্রবিদ্যা শিথিল । ক্রমশঃ তাহার যৌবনলক্ষণ দেখা দিল ; অনেক সন্ন্যাসী জানিল যে, এ ছদ্মবেশিনী স্ত্রীলোক । কিন্তু সন্ন্যাসীরা সচরাচর জিতেন্দিয়, কেহ কোন কথা কহিল না । সন্ন্যাসীদিগের মধ্যে অনেক পণ্ডিত ছিল । শান্তি সংস্কৃতে কিছু ব্যুৎপত্তি লাভ করিয়াছে দেখিয়া এক জন পণ্ডিত সন্ন্যাসী তাহাকে পড়াইতে লাগিলেন । সচরাচর সন্ন্যাসীরা জিতেন্দ্রিয় বলিয়াছি, কিন্তু সকলে নহে । এই পণ্ডিতও নহেন । অথবা ইনি শাস্তির অভিনব যৌবনবিকাশজনিত লাবণ্যে মুগ্ধ হইয়। ইন্দ্রিয় কর্তৃক পুনৰ্ব্বার নিপীডিত হইতে লাগিলেন । শিস্যাকে আদিরসাশিত কাব্য সকল পড়াইতে আরম্ভ করিলেন । আদিরসাশিত কবিতাগুলির অশ্রাব্য ব্যাখ্যা শুনাইতে লাগিলেন। তাহাতে শাস্তির কিছু অপকার না হইয়া কিছু উপকার হইল । লজ্জা কাহাকে বলে, শাস্তি তাহা শিখে নাই, এখন স্ত্রীস্বভাবসুলভ লজ্জা আসিয়া আপনিই উপস্থিত হইল”। পৌরুষচরিত্রের উপর নিৰ্ম্মল স্ত্রীচরিত্রের অপূৰ্ব্ব প্রভা আসিয়া পড়িয়া, শাস্তির গুণগ্রাম উদ্ভাসিত করিতে লাগিল। শাস্তি পড়া ছাড়িয়া দিল । ব্যাধ যেমন হরিণীর প্রতি ধাবমান হয়, শাস্তির অধ্যাপক শাস্তিকে দেখিলেই তাহার প্রতি সেইরূপ ধাবমান হইতে লাগিলেন । কিন্তু শাস্তি ব্যায়ামাদির S) দ্বারা পুরুষেরও দুল্লভ বলসঞ্চয় করিয়াছিল, অধ্যাপক নিকটে আসিলেই তাহাকে কিল ঘুষার দ্বারা পূজিত করিত—কলঘু্যাগুলি সহজ নহে । একদিন সন্ন্যাসী ঠাকুর শাস্তিকে নির্জনে পাইয়া বড় জোর করিয়া শাস্তির হাতখানা ধরিলেন, শান্তি ছাড়াইতে পারিল না । কিন্তু সন্ন্যাসীর দুর্ভাগ্যক্রমে হাতখান শাস্তির বঁ হাত, দাহিন হাতে শাস্তি তাহার কপালে এমনু জোরে ঘুষ মারিল যে, সন্ন্যাসী মূচ্ছিত হইয়া পড়িল। শান্তি সন্ন্যাসিসম্প্রদায় পরিত্যাগ করিয়া পলায়ন করিল । শান্তি ভয়শূঙ্গা একাই স্বদেশের সন্ধানে যাত্রা করিল। সাহসের ও বাহুবলের প্রভাবে নিৰ্ব্বিল্লে চলিল । ভিক্ষা করিয়৷ অথবা বঙ্গ ফলের দ্বার। উদর পোষণ করিতে করিতে এবং অনেক মারামারিতে জরী হইয়। শ্বশুরালয়ে আসিয়া উপস্থিত হইল । দেখিল, শ্বশুর স্বর্গারোহণ করিয়াছেন ; কিন্তু শাশুড়ী তাহাকে গৃহে স্থান দিলেন ন!—জাতি যাইবে । শাস্তি বাহির হুইয়া গেল । জীবানন্দ বাড়ী ছিলেন । তিনি শাস্তির অনুবর্তী হইলেন, পথে শান্তিকে ধরিয়া জিজ্ঞাস করিলেন, “তুমি কেন আমার গৃহভাগ করিয়া গিয়াছিলে ? এত দিন কোথায় ছিলে ?" শান্তি সকল সত্য বলিল । জীবানন্দ সত্যমিথ্য চিনিতে পারিতেন । জীবানন্দ শান্তির কথায় বিশ্বাস করিলেন । তাপসরোগণের ভ্ৰবিলাসযুক্ত কটাক্ষের জ্যোতিঃ লইয়া অতিযত্নে নিৰ্ম্মিত যে সম্মোহন শর, পুষ্পধন্বা তাহা পরিণীত দম্পতির প্রতি অপব্যয় করেন না। ইংরেজ পূর্ণিমার রাত্রে রাজপথে গ্যাস জালে, বাঙ্গালী তেলামাথায় তেল ঢালিয় দেয় ; মনুষ্যের কথ। দূরে থাক, চন্দ্রদেব স্থৰ্যদেবের পরেও কখন কখন আকাশে উদিত থাকেন ; ইন্দ্র সাগরে বৃষ্টি করেন, যে সিন্দুকে টাকা ছাপাছাপি, কুবের সেই সিন্দুকেই টাক। লইয়া যান ; যম যার প্রায় সবগুলিকে গ্ৰহণ করিয়াছেন, তারই বাকিটিকে লষ্টয়া যান ; কেবল রতিপতির এমন নিৰ্ব্বদ্ধিতার কাজ দেখা যায় না। যেখানে গাঁটছড়া বাধ হইল—সেখানে আর তিনি পরিশ্রম করেন না, প্রজাপতির উপর সকল ভার দিয়া, যাহার হৃদয়শোণিত পান করিতে পরিবেন, তাহার সন্ধানে যান, কিন্তু আজ বোধ হয় পুষ্পধন্বার কোন কাজ ছিল না—হঠাৎ দুইটা ফুলবাণ অপব্যয় করিলেন। একটা আসিয়া জীবানন্দের, হৃদয় ভেদ করিল—আর একটা আসিয়৷ শাস্তির বুকে ।