পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (তৃতীয় ভাগ).djvu/৪০

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


<。 সত্য । গোম্পদে যেমন জল । শাস্তি। সস্তানদিগের বাহুবল আপনি কখনও পরীক্ষা করিয়া থাকেন ? সত্য । থাকি । এই বলিয়া সত্যানন্দ এক ইস্পাতের ধনুক আর লোহার কতকট। তার আনিয়া দিলেন, বলিলেন যে, *এই ইস্পাতের ধনুকে এই লোহার তারে গুণ দিতে হয় । গুণের পরিমাণ দুই হাত । গুণ দিতে দিতে ধন্থক পড়ে, যে গুণ দেয়, তাকে ছুড়িয়া ফেলিয়া দেয়। যে গুণ দিতে পারে, সেই প্রকৃত বলবান ।” শাস্তি ধনুক ও তীর উত্তমরূপে পরীক্ষা করিয়া বলিল, “সকল সস্তান কি এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হুইয়াছে ?” সত্য । না, ইহা দ্বারা তাহাদিগের বল বুঝিয়াছি মাত্র । শাস্তি। কেহ কি এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় নাই ? সত্য । চারি জন মাত্র । শান্তি । জিজ্ঞাসা করিব কি, কে কে ? সত্য। নিষেধ কিছু নাই। এক জন আমি । শাস্তি । আর ? সত্য । জীবানন্দ । ভবানন্দ । জ্ঞানানন্দ । শাস্তি ধনুক লইল, তার লইল, অবহেলে তাহাতে গুণ দিয়া সত্যানন্দের চবণতলে ফেলিয়া দিল । সত্যাননা বিস্মিত, ভাত ও স্তম্ভিত হইয়৷ রহিলেন । কিয়ৎক্ষণ পরে বলিলেন "এ কি, তুমি দেবী ন৷ भांनबैौ ?” শাস্তি করজোড়ে বলিল, “আমি সামান্য মানবী, কিন্তু আমি ব্রহ্মচারিণী ” সত্য। তাই বা কিসে ? তুমি কি বালবিধবা ? মা, বালবিধবারও এত বল হয় না ; কেন না, তাহার। একাহারী । শাস্তি । আমি সধবা । সত্য ৷ তোমার স্বামী নিরুদ্দিষ্ট ? শাস্তি । উদ্দিষ্ট । তাহার উদেশেই আসিয়াছি । সহসা মেঘভাঙ্গ রৌদ্রের ন্যায় স্মৃতি সত্যানন্দের চিত্তকে প্রভাসিত করিল । তিনি বলিলেন, “মনে পড়িয়াছে। জীবানন্দের স্ত্রীর নাম শাস্তি ! তুমি কি জীবানন্দের ব্রাহ্মণী ?” এবার জটাভারে নবীনানন্দ মুখ ঢাকিল। যেন কতকগুলা হাতীর গুড় রাজীবরাজির উপর পড়িল । সত্যানন্দ বলিতে লাগিলেন, “কেন এ পাপাচার করিতে আসিলে ?” বঙ্কিমচন্দ্রের গ্রন্থাবলী শাস্তি সহসা জটাভার পৃষ্ঠে নিক্ষিপ্ত করিয়া উন্নতমুখে বলিল, “পাপাচরণ কি প্রভু ? পত্নী স্বামীর অনুসরণ করে, সে কি পাপাচরণ ? সন্তানধৰ্ম্মশাস্ত্র যদি একে পাপাচরণ বলে, তবে সন্তানধৰ্ম্ম অধৰ্ম্ম । আমি তাহার সহধৰ্ম্মিণী, তিনি ধৰ্ম্মাচরণে প্রবৃত্ত, আমি র্তাহার সঙ্গে ধৰ্ম্মাচরণ করিতে আসিয়াছি।” শাস্তির তেজস্বিনী বাণী শুনিয়া, উন্নত গ্রীবা, স্ফীত বক্ষ, কম্পিত অধর এবং উজ্জল অথচ অশ্রপুত চক্ষু দেখিয়া সত্যানন্দ প্রীত হইলেন। বলিলেন, “তুমি সাধবী, কিন্তু দেখ মা—পত্নী কেবল গৃহধৰ্ম্মেই সহধৰ্ম্মিণী—বীরধৰ্ম্মে রমণী কি ?" শাস্তি। কোন মহাবীর অপত্নীক হইয়া বীর হইয়াছেন ? রাম সীত। নহিলে কি বীর হইতেন ? অৰ্জ্জুনের কতকগুলি বিবাহ গণনা করুন দেখি ? ভীমের যত বল. ততগুলি পত্নী । কত বলিব ? আপনাকে বলিতেই বা কেন হুইবে ? সত্য। কথা সত্য, কিন্তু রণক্ষেত্রে কোন বীর জায় লইয়া আইসে ? শান্তি । অৰ্জ্জুন যখন যাদবী সেনার সহিত অন্তরীক্ষ হইতে যুদ্ধ করিয়াছিলেন, কে তাহার রথ চালাইয়াছিল ? দ্রৌপদী সঙ্গে না থাকিলে পাণ্ডব কি কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে যুঝিত ? সত্য । তা হউক, সামান্ত মনুষ্যদিগের মন স্ত্রীলোকে আসক্ত এবং কার্য্যে বিরত করে । এই জন্য সন্তানের ব্ৰতই এই ষে, রমণীজাতির সঙ্গে একাসনে উপবেশন করিবে না । জীবানন্দ আমার দক্ষিণ হস্ত । তুমি আমার ডান হাত ভাঙ্গিয় দিতে আসিয়াছ ? শাস্তি । আমি আপনার দক্ষিণ হস্তে বল বাড়াইতে আসিয়াছি । আমি ব্রহ্মচারিণী, প্রভুর কাছে ব্রহ্মচারিণীই থাকিব । আমি কেবল ধৰ্ম্মাচরণের জন্য আসিয়াছি, স্বামিদর্শনের জন্য নয় । বিরহযন্ত্রণায় আমি কাতরা নষ্ট । স্বামী যে ধৰ্ম্ম গ্রহণ করিয়াছেন, আমি তাহার ভাগিনী কেন হুইব না ? তাই আসিয়াছি । সত্য । ভাল, তোমায় দিন কত পরীক্ষা করিয়া দেখি । শাস্তি বলিল, “আনন্দমঠে আমি থাকিতে পাইব কি ?” সত্য । আজি আর কোথায় যাইবে ? শাস্তি। তার পর ? সত্য ৷ মা ভবানীর মত তোমারও ললাটে আগুন আছে, সন্তানসম্প্রদায় কেন দাহ করিবে ?