পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (তৃতীয় ভাগ).djvu/৫১

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


অনিন্দমঠ ছিল, ভবানন্দ গিয়া তাহার উপরে উপবেশন করিলেন । উপবেশন করিয়া ভবানন্দ চিন্তা করিতে লাগিলেন । রজনী ঘোর তমোময়ী। তাহাতে সেই অরণ্য অতি বিস্তৃত, একেবারে জনশূন্ত, অতিশয় নিবিড়, বৃক্ষলতা ফুর্ভেদ্য, বন্যপশুরও গমনাগমনের বিরোধী । বিশাল, জনশূন্ত, অন্ধকার, দুর্ভেদ্য, নীরব । রবের মধ্যে দূরে ব্যাভ্রের হুঙ্কার অথবা বস্ত শ্বাপদের ক্ষুধা, ভীতি বা আস্ফালনের বিকট শব্দ । কদাচিৎ কোন বুহৎ পক্ষীর পক্ষকম্পন, কদাচিৎ তাড়িত এবং তাড়নকারী, বধ্য এবং বধকারী পশুদিগের দ্রুতগমন-শব্দ । সেই বিজন অন্ধকারে ভগ্ন অট্টালিকার উপর বসিয়া একা ভবানন্দ । তাহার পক্ষে তখন যেন পুথিবী নাই অথবা কেবল উপাদানমন্ত্রী হইয়। আছেন । সেই সময়ে ভবানন্দ কপালে হাত দিয়া ভাবিতেছিলেন ; স্পন্দ নাই, নিশ্বাস নাই, ভয় নাই, অতি প্রগাঢ় চিন্তায় নিমগ্ন । মনে মনে বলিতেছিলেন, “ঘাঁহ৷ ভবিতব্য, তাহ অবগু হইবে । আমি ভাগীরথীজলতরঙ্গ সর্মীপে ক্ষুদ্র গজের মত ইন্দ্রিরস্রোতে ভাসির গেলাম, ইহাই আমার দুঃখ ৷ এক মুহূৰ্বে দেহের ধ্বংস হইতে পারে—দেহের ধ্বংসেষ্ট ইন্দ্রিয়ের পুব-স – আমি সেই ইন্দ্রিয়ের বশীভূত হইলাম ? আমার মরণ শেয়ঃ ধৰ্ম্মভ্যাস ! ছি মরিব ?” এমন সময়ে পেচক মাথার উপর গম্ভীর শব্দ করিল। ভবানন্দ তখন মুক্তকণ্ঠে বলিতে লাগিলেন, “ও কি শব্দ ? কানে যেন গেল, যম আমায় ডাকিতেছে । আমি জানি না, কে শব্দ করিল, কে আমায় ডাকিল , কে আমায় বিধি দিল, কে মরিতে বলিল । পুণ্যময়ী অনন্তে ! তুমি শব্দময়ী, কিন্তু তোমার শব্দের ত মৰ্ম্ম আমি বুঝিতে পারিতেছি না। আমায় ধৰ্ম্মে মতি দাও, আমায় পাপ হইতে বিরত কর । ধৰ্ম্মে,-- হে গুরুদেব ! ধৰ্ম্মে যেন আমার মতি থাকে " তখন সেই ভীষণ কাননমধ্য হইতে অতি মধুর অথচ গম্ভীর, মৰ্ম্মভেদী মনুষ্যকণ্ঠ শ্রত হইল ; কেহ বলিল, “ধৰ্ম্মে তোমার মতি থাকিবে-আশীৰ্ব্বাদ করিলাম।” ভবানন্দের শরীরে রোমাঞ্চ হুইল । এ কি এ ? এ যে গুরুদেবের কণ্ঠ ! “মহারাজ, কোথায় আপনি ? এ সময়ে দাসকে দর্শন দিন ।” কিন্তু কেহ দর্শন দিল না—কেহ উত্তর করিল নী । ভবানন্দ পুনঃ পুনঃ ডাকিলেন—উত্তর পাইলেন ੇ এদিক্ ওদিক্‌ খুজিলেন, কোথাও কেহ নাহ। அ-டி 8> যখন রজনী-প্রভাতে প্রাতঃস্থৰ্য্য উদিত হইয়া বৃহৎ । অরণ্যের শিরঃস্থ শু্যামল পত্ররাশিতে প্রতিভাসিত হইতেছিল, তখন ভবানন্দ মঠে আসিয়া উপস্থিত, হইলেন । কর্ণে প্রবেশ করিল—“হরে মুরারে! হরে । মুরারে " চিনিলেন, সত্যানন্দের কণ্ঠ । বুঝিলেন, প্রভু প্রত্যাগমন করিয়াছেন । সপ্তম পরিচ্ছেদ জীবানন্দ কুটীর হইতে বাহির হইয় গেলে পর, শান্তি দেবী আবার সারঙ্গ লইয়। মুহু মূঢ় রবে সঙ্গীত করিতে লাগিলেন ;– - “প্রলয়পয়োধিজলে ধৃতবানসি বেদং বিহিত বহিব্র-চরিত্রমখেদম, কেশব বুভমীনশরীর জয় জগদীশ হরে !” গোস্বামি-বিরচিত মধুর স্তোত্র যখন শাস্তিদেৰীকণ্ঠ নিঃস্ব ত হইয়। রাগ-তাল লয় সম্পূর্ণ হইয়া, সেই অনন্ত কাননের অনন্ত নীরবতা বিদীর্ণ করিয়া, পূর্ণ জলোচ্ছ্বাসের সময়ে বসন্তানিল তাড়িত তরঙ্গভঙ্গের স্তায় মধুর হইয়া আসিল, তখন তিনি গায়িলেন – “নিন্দসি যজ্ঞবিধেরহহ শ্ৰুতিজাতম্ সদয়-হৃদয়-দৰ্শিত পশুঘাতম্ কেশব ধৃতবুদ্ধশরীর জয় জগদীশ হরে !" তখন বাহির হইতে কে অতি গম্ভীররবে গায়িল, গম্ভীর মেঘগৰ্জ্জনবৎ তানে গায়িল,-- “মেচ্ছনিবন্থনিধনে কলয়সি করবালম্ ; ধুমকেতুমিব কিমপি করালম্ ; কেশব ধৃতকবিশরীর জয় জগদীশ হরে ।” শাস্তি ভক্তিভাবে প্রণত হইয়৷ সত্যানন্দের পদধূলি গ্রহণ করিল ; বলিল, “প্রভো, আমি এমন কি ভাগ্য করিয়াছি যে, আপনার শ্ৰীপাদপদ্ম এখানে দর্শন পাই—আজ্ঞ করুন, অামাকে কি করিতে হুইবে ?” বলিয়। সারঙ্গে সুর দিয়া শাস্তি আবার গায়িল ;– “তব চরণপ্রণত বয়মিতি ভাবয় কুরু কুশলং প্রণতেষু।” সত্যানন্দ বলিলেন, “মা, তোমার কুশলই হইবে।” শাস্তি । কিসে ঠাকুর—তোমার তো আজ্ঞা আছে—আমার বৈধব্য ! ༄༅།།