পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (তৃতীয় ভাগ).djvu/৬৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


আনন্দমঠ ন । নহিলে আমার পিছু পিছু অন্তঃপুরে আসিয়া উপস্থিত কেন ? - ম। কল্যাণীর সঙ্গে আমার কিছু কথা ছিল, তাই আসিয়াছি । ন । তবে এখন যান । আমারও কিছু কথা আছে । আপনি সরিয়া যান, আমি আগে কথা কই । আপনার ঘরবাড়ী, আপনি সৰ্ব্বদ আসিতে পারেন, আমি কষ্টে একবার অসিয়াছি। মহেন্দ্র বোকা হইয়। রছিলেন । কিছুষ্ট বুঝিতে পারিতেছেন না । এ সকল কথ। ত অপরাধীর কথাবাৰ্ত্তার মত নহে । কল্যাণীরও ভাব বিচিত্র । সেও ত অবিশ্বাসিনীর মত পলাইল না, ভীত হইল না, লজ্জিত নহে–বরং মুহূ মৃঢ় হাসিতেছে । আর কল্যাণী—যে সেই বৃক্ষতলে অনায়াসে বিষ ভোজন করিয়াছিল,—সে কি অপরাধিনী হইতে পারে ? মহেন্দ্র এই সকল ভাবিতেছেন, এমন সময়ে অভাগিনী শান্তি মহেন্দ্রের দুরবস্থা দেখিয়া ঈষৎ হাসিয়া কল্যাণীর প্রতি এক বিলোল কটাক্ষ নিক্ষেপ করিল । সহসা তখন অন্ধকার ঘুচিল, মহেন্দ্ৰ দেখি লেন, এ ধে রমণীকটাক্ষ । সাহসে ভর করিয়া, নবীনানন্দের দাড়ি ধরিয়া মহেন্দ্র এক টান দিলেন— কৃত্রিম দাড়ি-গোফ খসিয়া আসিল । সেই সময়ে অবসর পাইয়া কল্যাণী বাঘছালের গ্রন্থি খুলিয়। ফেলিল —বাঘছাল ও খসিয়া পড়িল । পুর। পড়িয। শান্তি নতমুখী হুইয়া রহিল। মহেন্দ্র তখন শাস্তিকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি কে ?” শ। শ্ৰীমান নবীনানন্দ গোস্বামী । ম। সে ত জুয়াচুরি, তুমি স্ত্রীলোক ? শা ! এখন কাজে কাজেই । ম। তবে একটা কথা জিজ্ঞাসা করি—তুমি স্ত্রীলোক হইয়া সৰ্ব্বদা জীবানন্দ ঠাকুরের সহবাস কর কেন ? শা। সে কথা আপনাকে নাই বলিলাম । ম। তুমি যে স্ত্রীলোক, জীবানন্দ ঠাকুর তা কি জানেন ? কল্যাণীর সঙ্গে শ' ] জানেন । শুনিয়া বিশুদ্ধাত্মা মহেন্দ্র অতিশয় বিষঃ হইলেন । দেখিয়া কল্যাণী আর থাকিতে পারিলেন ন! ; বলিলেন, “ইনি জীবানন্দ গোস্বামীর ধৰ্ম্মপত্নী শাস্তিদেবী ।” ৬১ মুহূৰ্ত্ত জন্য মহেঞ্জের মুখ প্রফুল্প হইল। আবার সে মুখ অন্ধকারে ঢাকিল। কল্যাণী বুঝিলেন, বলিলেন, “ইনি ব্রহ্মচারিণী |" চতুর্থ পরিচ্ছেদ উত্তর-বাঙ্গালা মুসলমানের হাতছাড়া হইয়াছে ; মুসলমান কেহই এ কথ। মানেন ন!—মনকে চোখ ঠারেন—বলেন, কতকগুলা লুঠেরাতে বড় দৌরাত্ম্য করিতেছে --শাসন করিতেছি । এইরূপ কত কাল যাইত, বলা যায় না । কিন্তু এই সময়ে ভগবানের নিস্লোগে ওয়ারেন হেষ্টিংস কলিকাতার গবর্ণর জেনারেল । ওয়ারেন হেষ্টিংস মনকে চোখ ঠারিবার লোক নহেন –তার সে বিদ্যা থাকিলে আজ ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য কোথায় থাকিত ? অগোঁণে সস্তান-শাসনার্থে Major E. wards নাম। দ্বিতীয় সেনাপতি নূতন সেনা লইয়। উপস্তিত হইলেন । এডওয়ার্ডস দেখিলেন যে, এ ইউরোপীয় যুদ্ধ নহে । শত্রুদিগের সেন নাই, নগর নাই, রাজধানী নাই, দুর্গ নাই, অথচ সকলই তাহাদের অধীন । যে দিন যেখানে ব্রিটিশসেনার শিবির, সেই দিনের জন্য সে স্থান ব্রিটিশসেনার অধীন—তার পরদিন ব্রিটিশসেনা চলিয়া গেল ত অমনি চারিদিকে “বনে মাতরম্ গীত হইতে লাগিল । সাহেব খুজিয়৷ পান না, কোথা হইতে ইঙ্গারা পিপীলিকার মত এক এক রাত্রে নির্গত হইয়া, যে গ্রাম ইংরেজের বশীভূত হয়, তাহ দাহ করিয়। ষায় অথবা অল্পসংখ্যক ব্রিটিশসেনা পাইলে তৎক্ষণাং সংহার করে । অমুসন্ধান করিতে করিতে সাহেব জানিলেন যে, পদচিহ্নে ইহার দুর্গ নিৰ্ম্মাণ করিয়া সেইখানে আপনাদিগের অস্ত্রাগার ও ধনাগার রক্ষা করিতেছে । অতএব সেই তুর্গ অধিকার করা বিধেয় বলিয়। স্থির করিলেন । চরের দ্বার। তিনি সংবাদ লইতে লাগিলেন যে, পদচিহ্নে কত সন্তান থাকে। যে সংবাদ পাইলেন, তাহাতে তিনি দুর্গ আক্রমণ করা বিধেয় বিবেচনা করিলেন না। মনে মনে এক অপূৰ্ব্ব কৌশল উদ্ভাবন করিলেন । মাঘী পূর্ণিমা সম্মুখে উপস্থিত। তাহার শিবিরের অদূরবর্তী নদীতীরে একটা মেলা হইবে । এবার মেলায় বড় ঘটা । সহজে মেলায় লক্ষ লোকের সমাগম হইয়া থাকে। এবার বৈষ্ণবের রাজা হইয়াছে, বৈষ্ণবের মেলায় আসিয়া বড় জাক করিবে সঙ্কল্প করিয়াছে । অতএব যাবতীয় সস্তানগণের পূর্ণিমার