পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (তৃতীয় ভাগ).djvu/৯৯

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


চন্দ্রশেখর এ দিকে প্রতাপ পান্ধী চলিয়া গেল দেখিয়। নৌকা হইতে নামিলেন। পূৰ্ব্বেই সকলে তাহার হাতের বন্দুক দেখিয় নিস্তব্ধ হইয়াছিল--এখন তাহার লাঠিয়াল সহায় দেখিয়া কেহ কিছু বলিল না । প্রতাপ নৌকা হইতে অবতরণ করিয়া আত্মগৃহাভিমুখে চলিলেন । তিনি গৃহদ্বারে আসিয়া দ্বার ঠেলিলে, রামচরণ দ্বার মোচন করিল । রামচরণ যে র্তাহার আজ্ঞার বিপরীত কার্য্য করিয়াছে, তাহ গৃহে অসিয়াই রামচরণের নিকট শুনি লন । শুনিয়া কিছু বিরক্ত হইলেন ; বলিলেন, “এখনও তাহাকে সঙ্গে করিয়া জগৎশেঠের গৃহুে লইয়া যাও । ডাকিয়া লইয়া আইস ।" রামচরণ আসিয়া দেখিল, লোকে শুনিয়া বিস্মিত হইবে, শৈবলিনী নিদ্র। যাইতেছেন। এ অবস্তায় নিদ্র। সস্তবে না । সম্ভবে কি না, তাহা আমর। জানি ন – আমরা যেমন ঘটিয়ছে, তেমনই লিখিতেছি । রাম ঢরণ শৈবলিনীকে জাগরিত না করিয়া প্রতাপের নিকট ফিরিয়া আসিয়া দলিল, “তিনি ঘুমাইক্রেছেন, ঘুম ভাঙ্গাইব কি ?” শুনিয়। প্রতাপ বিস্মিত হইলেন - মনে মনে বলিলেন, “চাণক পণ্ডিত লিখিতে ভুলিয়া ছন, নিদ্র স্ত্রীলোকের ধোল গুণ " প্রকাশে বলিলেন, “এত পীড়াপীড়িতে প্রয়োজন নাই । তুমিও ঘুমাও --পরিশ্রমের একশেল ইয়াছে । আমিও এখন একটু বিশাম করিপ " রামচরণ বিশ্রাম করিতে গেল । তখনও কিছু রাত্রি আছে ; গৃহ গৃহের বাহিরে নগরী– সৰ্ব্বত্র পদহীন, অন্ধকার । প্রতাপ একাকী নিঃশব্দে উপরে উঠিলেন । আপন শয়নকক্ষাভিমুখে চলিলেন । তথায় উপনীত হইয়া দ্বর মুক্ত করিলেন—দেখিলেন, পালঙ্কে শয়ানা শৈবলিনী ; রামচরণ বলিন্তে ভুলিয়া গিয়াছিল যে, প্রতাপের শয্যাগৃহেই সে শৈবলিনীকে রাখিয়া আসিয়াছে । প্রতাপ জ্বলিত প্রদীপালোকে দেখিলেন যে, শ্বেতশয্যার উপর কে নিৰ্ম্মল প্রস্ফুটিত কুমুমরাশি ঢালিয়। রাখিয়াছে। যেন বর্ষাকালে গঙ্গার স্থির শ্বেতবারি-বিস্তারের উপর কে প্রফুল্ল শ্বেতপদ্মরাশি ভাসাইয়া দিয়াছে । মনোমোহিনী স্থিরশোভা ! দেখিয়া প্রতাপ সহসা চক্ষু ফিরাইতে পারিলেন না । সৌন্দৰ্য মুগ্ধ হইয়। বা ইন্দ্রিয় বহুত প্রযুক্ত যে র্তাহার চক্ষু ফিরিল না, এমন নহে-কেবল অন্যমনবশতঃ তিনি বিমুগ্ধের ন্যায় চাহিয়৷ রহিলেন । অনেক দিনের কথা তাহার মনে পড়িল—অকস্মাৎ স্মৃতিসাগর মথিত হইয়া তরঙ্গের উপর তরঙ্গ প্ৰহত হইতে লাগিল । రిడ్జ్లో-రి ー、dt শৈবলিনী নিদ্রা যান নাই—চক্ষু মুদিয়া আপনার অবস্থা চিন্ত| করিতেছিলেন ; চক্ষু নিমীলিত দেখিয়া রামচরণ সিদ্ধান্ত করিয়াছিল যে, শৈবলিনী নিদ্রিতা, গাঢ় চিন্তাবশতঃ প্রতাপের প্রথম প্রবেশের পদধ্বনি শৈবলিনী শুনিতে পান নাই । প্রতাপ বন্দুকটি হাতে করিয়া উপরে আসিয়াছিলেন । এখন বন্দুকটি দেওয়ালে ঠেস দিয়া রাখিলেন। কিছু অন্যমন হইয়াছিলেন--সাবধানে বন্দুকটি রাখা হয় নাই ; বন্দুকটি রাখিতে পড়িয়া গেল । সেই শব্দে শৈবলিনী চক্ষু চাহিলেন—প্ৰতাপকে দেখিতে পাইলেন । শৈবলিনী চক্ষু মুছিয়। উঠিয়া বসিলেন । তখন শৈবলিনী উচ্চৈঃস্বরে বলিলেন, “এ কি এ ? কে তুমি ?” এই বলিয়া শৈবলিনী পালঙ্কে মূৰ্ছিত হইয়। পড়িলেন। প্রতাপ জল আনিয়া মূৰ্ছিত শৈবলিনীর মুখমণ্ডলে সিঞ্চন করিতে লাগিলেন—সে মুখ শিশিরনিষিক্ত পদ্মের মত শোভ। পাইতে লাগিল । জল কেশগুচ্ছ সকল আৰ্দ্ৰ করিয়া, কেশগুচ্ছ সকল ঋজু করিয়া ঝরিতে লাগিল—কেশ, পদ্মাবলম্ব শৈবালবৎ শোভা পাইতে লাগিল । অচিরাত শৈবলিনী সংজ্ঞাপ্রাপ্ত হইল । প্রতাপ দাড়াইলেন । শৈবলিনী স্থিরভাবে বলিলেন, “কে তুমি ? প্রতাপ ? না কোন দেবতা ছলনা করিতে আসিয়াছ ?" প্রতাপ বলিলেন, “আমি প্রতাপ ।” শৈ। একবার নৌকায় বোধ হইয়াছিল, যেন তোমার কণ্ঠ কানে প্রবেশ করিল। কিন্তু তখনই বুঝিলাম যে, সে ভ্রাস্তি । আমি স্বপ্ন দেখিতে দেখিতে জাগিয়াছিলাম, সেই কারণে ভ্ৰাস্তি মনে করিলাম । এই বলির দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া শৈবলিনী নীরব হইয়া রহিলেন । শৈবলিনী সম্পূর্ণরূপে স্বস্থির হইয়াছেন দেখিয়া প্রতাপ বিনা ৰাক্যব্যয়ে গমনোদ্যত হক্টলেন । শৈবলিনী বলিলেন, “যাইও না ।” প্রতাপ অনিচ্ছাপূর্বক দাড়াইলেন। শৈবলিনী জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি এখানে কেন আসিয়াছ ?” প্রতাপ বলিলেন, “আমার এই বাসা ।” শৈবলিনী বস্তুতঃ সুস্থিরা হন নাই ৷ হৃদয়মধ্যে অগ্নি জলিতেছিল—তাহার নখ পৰ্য্যন্ত কঁাপিতেছিল —সৰ্ব্বাঙ্গ রোমাঞ্চিত হইয়াছিল । তিনি আর একটু নীরব থাকিয়া, ধৈর্য্য সংগ্ৰহ করিয়া পুনরপি বলিলেন, “আমাকে এখানে কে আনিল ?”