পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (দ্বিতীয় ভাগ).djvu/১০৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।

কৃষ্ণকান্তের উইল ভ্র । থাক –কিন্তু আজি তোমার মুখ দেখিয়া তোমার কথার আওয়াজে বোধ হইতেছে, আজি কিছু হুইয়াছে । গে| কি হইয়াছে ? ভ্র । কি হইয়াছে, তাহা তুমি ন বলিলে আমি কি প্রকারে বলিব ? আমি কি সেখানে ছিলাম ? গো । কেন, সেটা মুখ দেখিয়া বলিতে পার না ? ত্র । তামাস রাখ–কথাটা ভাল কথা নহে । সেটা মুখ দেখিয়া বলিতে পারিতেছি—আমায় বল, আমার প্রাণ বড় কাতর হইয়াছে । বলিতে বলিতে ভ্রমরের চক্ষু দিয়া জল পড়িতে লাগিল । গোবিন্দলাল ভ্রমরের চক্ষের জল মুছাইয়া, আদর করিয়৷ বলিলেন, “আর একদিন বলিব ভ্রমর— আজ নহে ।” ভ্র । আজ নহে কেন ? গো । তুমি এখন বালিক, সে কথ। বালিকার শুনিয় কাজ নাই । ভ্র । কাল কি আমি বুড়া হইব ? গে। । কাল ও বলিব ন! দুষ্ট বৎসর পরে পলিব ! এখন আর জিজ্ঞাস করি ও না, ভ্রমর ! ভ্রমর দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিল । বলিল, “তবে ভাই -সৃষ্ট বৎসর পরেই বলিও । আমার শুনিবার বড় সাধ ছিল –কিন্তু তুমি যদি বলিলে ন— তবে আমি শুনিব কি প্রক রে ? আমার বড় মন কেমন কেমন করিতেছে !” কেমন একট। ধড় ভ1রী দুঃখ ভোমরার মনের ভিতর অন্ধকার করিয়। উঠিতে লাগিল । ধেমন বসস্তের আকাশ-বড় সুন্দর, বড় নীল, বড় উজ্জ্বলকোথাও কিছু নাই –অকস্মাং একখান। মেঘ উঠিয়৷ চারিদিক্‌ আঁধার করিয়া ফেলে –ভোমরার বোধ হইল, যেন তার বুকের ভিতর তেমনি একখান মেঘ উঠিয়া সহস। চারিদিক্‌ আঁধার করিয়া ফেলিল ! ভ্রমরের চক্ষে জল আসিতে লাগিল । ভ্রমর মনে করিল, “আমি অকারণে কাদিতেছি— আমি বড় দুষ্ট হইয়াছি--আমার স্বামী রাগ করিবেন।" অতএব ভ্রমর কঁাদিতে কঁাদিতে বাহির হইয়া গিয়া কোণে বসিয়৷ প। ছড়াইয়। অন্নদামঙ্গল পড়িতে বসিল ! কি মাথামুণ্ড পড়িল তাহ বলিতে পারি না, কিন্তু বুকের ভিতর হইতে সে কালে মেঘখান কিছুতেই নামিল না । ২য়-১৪ ६१ উনবিংশ পরিচ্ছেদ " গোবিন্দলাল বাবু জেঠামহাশয়ের সঙ্গে বৈষয়িক কথোপকথনে প্রবৃত্ত হইলেন । কথোপকথনচ্ছলে কোন জমীদারীর কিরূপ অবস্থা, তাহা সকল জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন । কৃষ্ণকান্ত গোবিনালালের বিষয়াতুরাগ দেখিয়া সস্তুষ্ট হইয়। বলিলেন, “তোমরা ষদি একটু একটু দেখ শুন তবে বড় ভাল হয়। দেখ, আমি আর কয় দিন ? তোমরা এখন হইতে সৰু দেখিয়া শুনিয়। ন! রাখিলে, আমি মরিলে কিছু বুঝিতে পরিবে না । দেখ, আমি বড় হইয়াছি, আর কোথাও যাইতে পারি না । কিন্তু বিনা তদারকে মহল সব খারাপ হইয়া উঠিল ।” গোবিন্দলাল বলিলেন, “আপনি পাঠাইলে আমি যাইতে পারি । আমারও ইচ্ছা, সকল মহালগুলি একবার দেখিয়া আসি ।” কৃষ্ণকান্ত আহলাদিত হইলেন । বলিলেন,— “আমার তাহাতে বড় আহলাদ । আপাততঃ বন্দরখালিতে কিছু গোলমাল উপস্থিত । নীয়েব বলিতেছে যে, প্রজার ধৰ্ম্মঘট করিয়াছে, টাকা দেয় না ; প্রজার বলে, তামির খাজনা দিতেছি, নায়েব উস্কুল দেয় না । তোমার যদি ইচ্ছ। থাকে, তবে বল আমি তোমাকে সেখানে পাঠাইবার উদ্যোগ করি ।” গোবিন্দলাল সম্মত হইলেন । তিনি এই জন্যই কৃষ্ণকাস্তের কাছে আসিয়াছিলেন ; তাহার এই পূর্ণ যৌবন, মনোবৃত্তি সকল উদ্বেলিত সাগরতরঙ্গ তুল্য প্রবল, রূপতৃষ্ণ অত্যন্ত তীব্র । ভ্রমর হইতে সে তুষ্ণ নিধারিত হয় নাই । নিদাঘের নীলমেঘমালার মত রোহিণীর রূপ এই চাতকের লোচন পথে উদিত হইল-প্রথম বর্ষার মেঘদর্শনে চঞ্চল। ময়ুরীর মত গোবিন্দলালের মন রোহিণীর রূপ দেখিয়া নাচিয়া উঠিল । গোবিন্দলাল তাহা বুঝিয়া মনে মনে শপথ করিয়া স্থির করিলেন, মরিতে হয় মরিব, কিন্তু তথাপি ভ্রমরের কাছে অবিশ্বাসী বা কৃতঘ্ন হইব না । তিনি মনে মনে স্থির করিলেন যে,--বিষয়কৰ্ম্মে মনোভিনিবেশ করিয়া রোহিণীকে ভুলিব—স্থানান্তরে গেলে নিশ্চিত ভুলিতে পারিব । এইরূপ মনে মনে সঙ্কল্প করিয়া তিনি পিতৃব্যের কাছে গিয়া বিষয়ালোচনা করিতে বসিয়াছিলেন । বন্দরখালির কথা শুনিয়া আগ্রহসহকারে তথায় গমনে সন্মত হইলেন । ভ্রমর শুনিল, মেজবাবু দেহাতে যাইবেন । ভ্রমর ধরিল, আমিও যাইব । কাদাকাটি ছাটাহঁাটি পড়িয়া, গেল। কিন্তু ভ্রমরের শাশুড়ী কিছুতেই যাইতে দিলেন