পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/৪২

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


রাজসিংহ, : ছবি লটকান—তবে চিত্রগুলি একটু বেশী মাত্রায় রঙ্গদার, আধুনিক ভাষায় “obscene, প্রাচীন ভাষায় "আদিরসাশিত ” মধ্যস্থানে কোমল গালিচায় বসিয়া—দোকানের অধিকারিণী তামূলবিক্রেত্ৰী— বয়সে ত্রিশের উপর, কিন্তু কুরূপ নহে। বর্ণ গেীর, চক্ষু বড় বড়, চাহনি বড় চঞ্চল, হাসি বড় রঙ্গদারসে হাসি অনিন্দ্য দস্তশ্রেণীমধ্যে সৰ্ব্বদাই খেলিতেছে— হাসির সঙ্গে সৰ্ব্বালঙ্কার ফুলিতেছে—অলঙ্কার কতক রূপা, কতক সোনা—কিন্তু সুগঠন এবং সুশোভন । মাণিকলাল দেখিয়া শুনিয়া পান চাহিল । পানওয়ালী স্বয়ং পান বেচে না—সম্মুখে এক জন দাসীতে পান সাজিতেছে ও বেচিতেছে--পানওয়ালী কেবল পয়সা কুড়াইতেছে—এবং মিষ্ট হাসিতেছে। দাসী একজন পান সাজিয়া দিল ; মাণিকলাল ডবল দাম দিল । আবার পান চাহিল ; যতক্ষণ পান সাজা হইতেছিল, ততক্ষণ মাণিক পানওয়ালীর সঙ্গে হাসিয়া হাসিয়া দুষ্ট একটা মিষ্টকথা কহিতে লাগিল ; পানওয়ালীর রূপের প্রশংসা করিলে পাছে সে কিছু মন্দ ভাবে, এ জন্য প্রথমে তাহার দোকানসজ্জা ও অলস্কারগুলির প্রশংসা করিতে লাগিল ৷ পানওয়ালীও একটু ভিজিল ৷ পানওয়ালী মিঠে পানের সঙ্গে মিঠে কথা বেচিতে আরম্ভ করিল । মাণিকলাল তখন দোকানে উঠিয়া বসিয়া পান চিবাইতে চিবাইতে পানওয়ালীর হুক কাড়িয়া লইয়া টানিতে আরম্ভ করিল । এ দিকে মাণিকলাল পান খাইয়া দোকানের মসলা ফুরাইয়া দিল । দাসী মসলা আনিতে অন্য দোকানে গেল । সেই অবসরে মাণিকলাল পানওয়ালীকে বলিল, “মহারাজিয়া ! তুমি বড় চতুর। আমি একটি চতুরা স্ত্রীলোক খুজিতেছিলাম, আমার একটি দু্যমন আছে —তাহাকে একটু জব্দ করিব ইচ্ছা । কি করিতে হইবে, তাহা তোমাকে বুঝাইয়৷ বলিতেছি । তুমি যদি আমার সহায়তা কর, তবে এক আসরফি পুরস্কার করিব ।” পান । কি করিতে হুইবে ? মাণিক চুপি চুপি কি বলিল। পানওয়ালী বড় রঙ্গপ্রিয়া—তৎক্ষণাৎ সম্মত হুইল । বলিল, “আসরফির প্রয়োজন নাই—রঙ্গই আমার পুরস্কার।" মাণিকলাল তখন দোয়াত, কলম, কাগজ চাহিল । দাসী তাহ নিকটস্থ বেণিয়ার দোকান হইতে আনিয়া দিল। মাণিক পানওয়ালীর সঙ্গে পরামর্শ করিয়া এই পত্র লিখিল, “হে প্রাণনাথ ! তুমি যখন নগরভ্রমণে আসিয়াছিলে, আমি তোমাকে দেখিয়া অতিশয় মুগ্ধ হইয়াছিলাম। তোমার একবার ❖ፃ দেখা না পাইলে আমার প্রাণ যাইবে । শুনিতেছি, তোমরা কাল চলিয়া যাইবে—অতএব আজ একবার আবশ্ব অবশু আমায় দেখা দিবে । নহিলে আমি গলায় ছুরি দিব । যে পত্র লইয়া যাইতেছে—তাহার সঙ্গে আসিও, সে পথ দেখাইয়া লইয়া আসিবে ।” পত্র লেখা হইলে মাণিকলাল শিরোনামা দিল, “भङ्ग्रल शै। !” পানওয়ালী জিজ্ঞাসা করিল, “কে ও ব্যক্তি ?” মাণিক ৷ এক জন মোগল সওয়ার । বাস্তবিক, মাণিকলাল মোগলদিগের মধ্যে এক জনকেও চিনিত না । কাহারও নাম জানে না । সে মনে ভাবিল, দুই হাজার মোগলের মধ্যে অবশ্য এক জন মহম্মদ অাছেই আছে—আর সকল মোগলই “খ৷ ” অতএব সাহস করিয়া “মহম্মদ খা” লিখিল ; লেখা হইলে মাণিকলাল বলিল, “তাহাকে এইখানে আনিব ?” পানওয়ালী বলিল, “এ ঘরে হইবে না । একটা ঘর ভাড়া লইতে হইবে।” তখনই দুই জনে বাজারে গিয়া আর একটা ঘর লইল । পানওয়ালী মোগলের অভ্যর্থনা-জন্ত তাহা সজ্জিতকরণে প্রস্তুত হইল—মাণিকলাল পত্র লইয়া মুসলমানশিবিরে উপস্থিত হইল। শিবিরমধ্যে মহাগোলযোগ—কোন শৃঙ্খলা নাই—নিয়ম নাই । তাহার ভিতরে বাজার বসিয়া গিয়াছে—রঙ্গ-তামাস রোশনাইয়ের ধূম লাগিয়াছে। মাণিকলাল মোগল দেখিলেই জিজ্ঞাসা করে, “মহম্মদ খা কে মহাশয় ? র্তাহার নামে পত্র আছে।” কেহ উত্তর দেয় না— কেহ গালি দেয় ;–কেহ বলে, চিনি না –কেহ বলে, “খুজিয় লও।” শেষ এক জন মোগল বলিল, “মহম্মদ খাকে চিনি না, কিন্তু আমার নাম মুর মহম্মদ খা । পত্র দেখি, দেখিলে বুঝিতে পারিব, পত্র আমার কি ন৷ ” মাণিকলাল সানন্দচিত্তে তাহার হস্তে পত্র দিল— মনে জানে, মোগল ষেই হউক, ফাদে পড়িবে। মোগলও ভাবিল—পত্র যারই হউক, আমি কেন এই সুবিধাতে বিবিটাকে দেখিয়া আসি না । প্রকাপ্তে বলিল, “হা, পত্র আমারই বটে। চল, আমি তোমার সঙ্গে যাইতেছি।” এই বলিয়া মোগল তামুমধ্যে প্রবেশ করিয়া চুল আঁচড়াইয়া, গন্ধদ্রব্য মাখিয়া, পোষাক পরিয়া বাহির হইল । বাহির হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, “ওরে ভূত্য, সে স্থান কত দুর ?" মাণিকলাল যোড়হাত করিয়া বলিল, “হুজুর, অনেক দূর । ঘোড়ায় গেলে ভাল হইত।” অীর