পাতা:বড়দিদি-শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়.djvu/৩৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটিকে বৈধকরণ করা হয়েছে। পাতাটিতে কোনো প্রকার ভুল পেলে তা ঠিক করুন বা জানান।
বড়দিদি
২৮
 


নিকট স্নেহ যত্ন পায়, সেও পায়। বিশ্বের ভাণ্ডার তাহার নিকট গচ্ছিত আছে, যে চাহে, সে পায়— সুরেন্দ্রও লইয়াছে, ইহাতে আশ্চর্য্যের কথা আর কি? মেঘের কাজ, জল বরিষণ করা, বড়দিদির কাজ, স্নেহ-যত্ন করা। যখন বৃষ্টি পড়ে, তখন যে হাত পাতে, সেই জল পায়;— বড়দিদির নিকট হাত পাতিলে অভীষ্ট-পদার্থ পাওয়া যায়। মেঘের মতই বুঝি সে অন্ধ, কামনা এবং আকাঙ্ক্ষাহীন! মোটের উপর সে এমনি একটা ধারণা করিয়া রাখিয়াছিল । আসিয়া অবধি সে যে ধারণা গড়িয়া রাখিয়াছিল— আজও তাহাই আছে, শুধু এই কাশী গমন ঘটনাটির পর হইতে এইটুকু সে বেশী জানিয়াছে যে, এই বড়দিদি ভিন্ন তাহার এক দণ্ডও চলিতে পারে না।

 সে যখন বাড়িতে ছিল তখন তাহার পিতাকে জানিত, বিমাতাকে জানিত। তাঁহাদের কর্ত্তব্য কি তাহা বুঝিত, কিন্তু বড়দিদি বলিয়া কাহারো সহিত পরিচিত হয় নাই— যখন পরিচয় হইয়াছে, তখন সে এমনই বুঝিয়াছে। কিন্তু মানুষটিকে সে চিনে না, জানে না, শুধু নামটি জানে, নামটি চিনে, লোকটি তাহার কেহ নহে। নামটি সর্ব্বস্ব!

 লোকে যেমন ইষ্ট-দেবতাকে দেখিতে পায় না, শুধু নামটি শিখিয়া রাখে, দুঃখে কষ্টে সেই নামটির সম্মুখে সমস্ত হৃদয় মুক্ত করে, নতজানু হইয়া করুণাভিক্ষা চাহে, চক্ষে জল আসে, মুছিয়া ফেলিয়া শূন্য-দৃষ্টিতে কাহাকে যেন দেখিতে চাহে— কিছুই দেখা যায় না; অস্পষ্ট জিহ্বা শুধু দুটি কথা অস্ফুট উচ্চারণ করিয়া থামিয়া যায়। দুঃখ পাইয়া তাই সুরেন্দ্রনাথও অস্ফুটে উচ্চারণ করিল, “বড়দিদি!”


———