8& বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র : অষ্টম খন্ড l 8br l মোহাম্মদ আবু নূর শিক্ষক, সিদ্ধেশ্বরী হাই স্কুল ঢাকা আমি সিদ্ধেশ্বরী হাই স্কুলের সহকারী শিক্ষক। একদিন ভারতে যাবার ব্যাপারে স্কুল থেকে কিছু পাওনা টাকা তুলতে গেছি। এমন সময় পাঞ্জাবী পুলিশের একটি দল আমাকে এবং আমার বন্ধু সহকর্মী নজমুল হোসেনকে ধরে নিয়ে রাজারবাগ চলে যায়। সেখানে আমাদের অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। বসিয়ে রাখে এবং মাঝে মাঝে চড়থাপ্পড় দিতে থাকে। সেখান থেকে আমাদেরকে রমনা থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। রমনা থানায় লকআপে থাকবার সময় সেখানে আরো অনেক ছেলেকে অত্যাচার-জর্জরিত অবস্থায় দেখতে পাই। ঘন্টাখানেক পর আমাদেরকে লকআপ থেকে বারান্দায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে প্রথমে আমার সহকর্মীর ওপর দৈহিক পীড়ন শুরু করা হয়। তাঁকে বেতের মোটা লঠি দিয়ে অমানুষিকভাবে প্রহার করা হয়। তার পা মুচড়ে ফেলা হয়। কিন্তু তিনি এরপরও কোন গুপ্ত খবর দিতে অস্বীকার করেন। তারপর শুরু হয় আমার পালা। আমাকে তারা নিদারুন লাঠিপেটা করে এবং আমার পা-ও তারা মুচড়ে ফেলে। কিন্তু আমিও কোন গোপন কথা বলতে সম্মত হইনি। ঘন্টাখানেক পর একজন ডি,এস,পি এসে আমাদেরকে আবার রাজারবাগ পুলিশ লাইনে নিয়ে যায়। সেখানে অন্যান্য আরো অনেকের সঙ্গে আমাকে ২৪ দিনের জন্য বন্দী করে রাখা হয়। প্রথম দিন রাতে তারা কোন এক পিতা ও তাঁর পুত্রকে একই সঙ্গে উলঙ্গ করে ঐ অবস্থায় সবার সামনে সরারাত দাঁড় করিয়ে রাখে এবং মারধর করে। আমাকে এবং অন্যান্য সবাইকে তারা সকালে দুপুরে ও সন্ধ্যায় নিয়মমাফিক মারধর করত ও জোর করে জবানবন্দী আদায় করে নিত। তবে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই আমরা সবাই সত্যকে গোপন করে যেতাম। পাঞ্জাবী পুলিশেরা ছাড়াও পাক সেনা বা ই,পি,সি,এ,এফ যারাই আসত তারাই একবার করে এসে আমাদের ধোলাই করে যেত। অনেকেই প্ৰহারের ফলে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলত। মাঝে মাঝে মধ্যরাতে এসে ঘুম থেকে উঠিয়ে তারা নির্যাতন চালাত। ওরা নিয়মিত আমাদেরকে কিছু খেতে দিত না। তবে মাঝে মাঝে তাদের উচ্ছিষ্ট তারা আমাদের খেতে দিত। বিশেষ করে মারধর করবার সময় পানি চাইলে তারা পানি খেতে দিত না। যেত। একদিন ওরা আমার দুই হাত বেঁধে ওপরের দিকে ঐ অবস্থায় একনাগাড়ে ৪৮ ঘন্ট দাঁড় করিয়ে রাখে। বাঁধন খুলে দেবার পরপরই আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। আমার পা ভীষণ রকম ফুলে যায় এবং সাধারণভবে চলাফেরা করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলি। একদিন কোন এক বন্দীকে তারা পিটিয়ে মেরে ফেলে। তারপর মৃতদেহ বস্তায় পুরে তারা নিয়ে যায়। ওখানে একটা ছেলেকে পিঠমোড়া করে সারাদিন বেঁধে রাখে ফলে তার পচনক্রিয়া আরম্ভ হয়। ঐ অবস্থার পরে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। একদিন সকালে পাঞ্জাবী পুলিশ এসে আমাকে বন্দুকের বট দিয়ে পিটাতে শুরু করে, তখন আমার পরনে শুধু একটা জাংগিয়া ছিল এবং হাত উপরের দিকে বাঁধা অবস্থায় ছিল। সে অবস্থায় একজন মিলিটারী অফিসার, ডি,এস,পি,আর,আই এবং কয়েকজন পুলিশ এসে আমাকে ঘিরে ফেলে, তারা প্রত্যেকেই আমার উপর কিল, ঘুষি, চপেটাঘাত, লাথি এবং থাপ্পড় চালাতে থাকে। আমার বুকের উপর একজন একটা রিভলবার ধরে তাদের ইচ্ছামত স্বীকারোক্তি আদায় করার চেষ্টা করে। কিন্তু আমি কোন গোপন তথ্য প্রকাশ না করলে তারা আরো কিছুক্ষণ মারধর করে চলে যায়।
পাতা:বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র (অষ্টম খণ্ড).pdf/৭২
অবয়ব