পাতা:বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র (দশম খণ্ড).pdf/৩৪০

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র : দশম খণ্ড
315

কাজিমউদ্দিন, সুবেদার মুহাম্মদ আবদুল হাফিজ, নায়েক সুবেদার হাজী মুরাদ আলী এবং নয়িক সুবেদার আব্দুল খালেকের নাম উল্লেখযোগ্য। সি-ও সাহেব বলিলেন, “আমাদের মুক্তিবাহিনী পুরোপুরি সংগঠিত হইতে যাইতেছে এবং ভবিষ্যতে আমাদেরে যুদ্ধের অসুবিধা অনেক ক্ষেত্রেই লাঘব হইবে।” তারপর তিনি সঙ্গে আসা সেই নতুন অফিসারকে পরিচয় করাইয়া দিলেন এবং তাহাকে আমাদের সাব-সেক্টরের ফিল্ড অফিসার হিসাবে নিযুক্ত দিলেন। অন্যান্য অফিসারের অনুপস্থিতিতে সাময়িকভাবে তিনি সাব-সেক্টর কমাণ্ডার পদেও অধিষ্ঠিত হইলেন। আমি আবার সহকারী হিসেবে কাজ করিতে লাগিলাম।

 নূতন ফিল্ড অফিসার পাইয়া আমরা ভারী খুশী। তাহার সঙ্গে অনেক কথাবার্তা হইল। খুব হাসিখুশী, চটপটে আর ছোট্ট গড়নের মানুষটি তিনি, কিন্তু তেজোদিপ্ত চেহারা। পাক পদাতিক বাহিনীর ক্যাপ্টেন তিনি। নাম সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খান। কুমিল্লার অধিবাসী। বর্তমান বসতি চাটগাঁ। ’৬৮তে কমিশন পাইয়াছেন- শুরুতে ১১-বালুচ ও পরে ৩১-এফ-এফ রেজিমেণ্টে চাকুরী করিয়াছেন। সেখান হইতে ন্যাশনাল সার্ভিস ক্যাডেট কোরে চলিয়া যান এবং পলায়ন পূর্বপর্যন্ত লাহোর রৈস্যাবারে পি-টি-এস-ও এবং প্রশিক্ষণদাতার পদে বহাল ছিলেন। কার্য উপলক্ষে আজাদ কাশ্মীর, ঝিলাম, মংলা, শিয়ালকোট প্রভৃতি স্থান ঘুরিয়া অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তিনি। '৭১ সালের ৩রা জুলাই কোন এক সুযোগে (পশ্চিম) পাকিস্তান হইতে পালাইয়া আসেন তিনি মুক্তিবাহিনীতে যোগদান করিতে। শুধু নিজেই আসেন নাই সঙ্গে নিয়া আসিয়াছেন আরও তিনজন অফিসার। যাই হউক, অতঃপর কনফারেন্স শেষে অফিসাররা চলিয়া গেলেন সেদিনকার মত।

 ১৮ই জুলাই ক্যাপ্টেন শাহরিয়ার আমাদের অধিনায়ক পদে যোগদান করিলেন দেবনগরে। দেখিলাম আমাদের প্রথম দর্শনের অনুমান মিথ্যা নয়। তাহার উপস্থিতিতে আমাদের মুক্তিসংগ্রাম অভূতপূর্ব এক নিহত মোড় নিল। তাহার যাদুস্পর্শে যেন সঞ্জীবিত হইয়া উঠিল সুপ্ত সাব-সেক্টর, অকুতোভয় অপারাজেয় মনোবলের অধিকারী আর নিবেদিতপ্রাণ খাঁটি বাংলা মায়ের সন্তান তিনি। নিমেষে খাপ খাওয়াইয়া নিলেন নিজেকে বাংলার কাদামাটির সঙ্গে। নিখুঁত বীর, মর্দে মোজাহিদ তিনি। মুক্ত এলাকার জনসাধারণ এবং আমরা তাহার কাজে মুগ্ধ হইয়া আদর করিয়া তাহাকে বাংলার বিচ্ছু বলিয়া ডাকিতাম। অনেকের মত নাক সিটকাইয়া ভ্রু কুচকাইয়া ভড়ং দেখান না। তিনি আসিয়াই সমস্ত ডিফেন্স এরিয়া ঘুরিয়া প্রত্যেকটি সৈনিকের সঙ্গে দেখা করিলেন এবং তাহাদিগকে বিভিন্নভাবে সান্ত্বনা ও উৎসাহ দান করিলেন। সৈনিকেরা তাঁহার পরশে আবার যেন নতুন করিয়া আশার আলো দেখিতে পাইল। তাহাদের এতদিনের শূন্যতা ঘুচিয়া একটা মুখ্য অভাব পূরণ হইল। কারণ ক্যাপ্টেন ছিলেন পদাতিক বাহিনীর লোক। তাই নবম শাখার অভাব-অসুবিধা সম্বন্ধে অবগত হইতে এবং খুটিনাটি খুঁজিয়া বাহির করিতে তাঁহার বেশী সময়ের প্রয়োজন হয় নাই। অবশ্য মানসিক ও দৈহিক পরিশ্রম করিতে হইয়াছিল যথেষ্ট। সবচেয়ে বড় অসুবিধা ছিল রেশন ও গোলাবারুদ সরবরাহ ও সংগ্রহ নিয়া। এক সপ্তাহের মধ্যে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ ও এজেন্সীর সাথে যোগাযোগ করিয়া আন্তরিক সম্পর্কের মাধ্যম সংগ্রহ ও সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করিয়া আনিলেন তিনি। তারপর ডিফেনসিভ পজিশন ও যুদ্ধের অন্যান্য জরুরী ব্যাপারগুলির খুটিনাটি খুঁজিয়া বাহির করিয়া কিছুটা ঠিক করিলেন। যে সমস্ত সৈন্য নানাভাবে বিভিন্ন সময়ে ছত্রভঙ্গ হইয়া বিভিন্ন জায়গায় আশ্রয় নিয়াছিল তাহাদিগকে খবর পাঠানো হইল। কোন কোন স্থানে লোকও পাঠানো হইল যাহাতে তাহারা নিজেদের ইউনিটে যোগদান করে। ক্রমে সৈন্যসংখ্যা বাড়িতে লাগিল এবং তাহারা মাসিক ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা পাইতে শুরু করিল। সৈন্যদের মনোবল ক্রমাগত দৃঢ় হইতে লাগিল এবং সঙ্গে সঙ্গে পাকবাহিনী বিভিন্ন অপারেশনের মাধ্যমে বুঝিতে পারিল এই এলাকায় মুক্তিবাহিনীর শক্তি ও রণনৈপুণ্য দিন দিন বাড়িয়া চলিয়াছে। তাই তাহারাও তাহাদের শক্তি ও সংখ্যা বাড়াইতে লাগিল। এইদিকে নবম শাখার কিছু লোক, পুলিশ ও আনসার তেঁতুলিয়া, বাংলাবান্ধা ও অন্যান্য স্থানে বিশ্রামে রত ছিল। ক্যাপ্টেন শাহরিয়ার সেই দিকেও খেয়াল করিলেন। ইতিমধ্যে আমাদের পুরাতন তিনটি কোম্পানী পঞ্চগড়ের দিকে আরও দুই মাইল অগ্রসর হইয়া পজিশন নিল। পাকিস্তানীদের শক্তি এবং সংখ্যাও দিন দিন বাড়িতে লাগিল। তাই তেঁতুলিয়া ও অন্যান্য স্থানের বিশ্রামরত লোকদেরকে ক্যাপ্টেন নিজে গিয়া যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়া আসিলেন এবং তাহাদিগকে নিয়া নতুন কোম্পানী খাড়া