বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র (পঞ্চম খণ্ড).pdf/১৪৪

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

120

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খণ্ড

  এই উপমহাদেশের বর্তমানে উত্তেজনাকর পরিবেশের পটভূমিতে বঙ্গবন্ধুর মুক্তিদান এবং বাংলাদেশ ইসু’র রাজনৈতিক সমাধানের জন্য জেনারেল ইয়াহিয়ার প্রতি শ্রীমতী গান্ধীর এই আহবানের তাৎপর্য অপরিসীম। ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের মধ্যে একটা ভয়াল রক্তক্ষয়ী এ্যাডভেঞ্চার পরিহার করে বাস্তবতার আলোকে বিরাজমান গুরুতর সমস্যা থেকে শান্তিপূর্ণ পরিত্রানের এটাই সম্ভবত বিশেষ মানবিক আহবান। ইয়াহিয়া খান যদি শ্রীমতী গান্ধীর এই ডাকে সাড়া দিতে ব্যর্থ হয়, অনুমান করা অন্যায় হবে না যে, এই উপমহাদেশে উত্তেজনার বারুদস্তুপে জল্লাদী হামলার অগ্নিস্ফুলিঙ্গের সংযোগে, সর্বাত্মক যুদ্ধের দাবানল দাউ দাউ করে জুলে উঠবে। আর তার পরিণতি হবে ভয়াবহ।

  ইয়াহিয়া খান শুধু মানবেতিহাসের ঘৃণ্যতম জল্লাদই-নয় কটচক্রান্তের এক ঘৃণিত নায়ক। যে পশ্চিম পাঞ্জাবী শোষক-পুঁজিপতি-উপনিবেশবাদী চক্রের সে ভাড়াটিয়া গোলাম, তাদের স্বার্থরক্ষার জন্য ইয়াহিয়া না করতে পারে এমন কোন কাজ নেই। বাঙালীদের বুকের ওপর দিয়ে ঔপনিবেশিক দুঃশাসনের রথচক্র চালিয়ে যাওয়া অব্যাহত রাখার জন্যই জল্লাদ ইয়াহিয়া বাংলাদেশের বর্বর গণহত্যাযজ্ঞ, লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ আর নারী-ধর্ষণের পাশবিক উন্মত্ততায় লিপ্ত হয়েছে। এই জঘন্য উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্যই সে দশ লক্ষ বাঙালীর নরকঙ্কালের ওপর বিচার প্রহসনের মঞ্চ সাজিয়ে মেতে উঠেছে বঙ্গবন্ধুর জীবন নিয়ে রাজনৈতিক জুয়াখেলায়। কাহিনীর এখানেই শেষ নয়। ২৬শে মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে বাংলাদেশে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবার পর থেকেই ইয়াহিয়া খান চেষ্টা করে এসেছে বাংলাদেশ ইস্যকে ভারত-পাকিস্তান বিরোধের চেহারা প্রস্তাব দিতে। এই উদ্দেশ্যেই সে বারবার ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বৈঠকের প্রস্তাব দিয়েছে। প্রত্যাখাত হয়েও আবার প্রস্তাব দিয়েছে। এই একই উদ্দেশ্যেই জল্লাদ ইয়াহিয়া ইরান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন এবং সর্বশেষ সুইজারল্যাণ্ডের কাছে তথাকথিত ভারত-পাকিস্তানে বিরোধ মীমাংসার মধ্যস্থতা করার জন্য ধর্না পাকিস্তান বিরোধের জগদ্দল পাথরের তলায় চাপা দিয়ে জননী বাংলার স্বাধীনতার স্বপ্ন আর সংগ্রামকে পিষে মারা। পাকিস্তান যদি ভারত আক্রমণ করে তারও পিছনে সক্রিয় এই একই দুরভিসন্ধি।..

১১ ডিসেম্বর, ১৯৭১

  ইয়াহিয়ার অপকর্মের দোসর স্বঘোষিত ডেনমার্কের যুবরাজ জুলফিকার আলী ভুট্টো ৮-সদস্যের এক প্রতিনিধিদলের নেতা হিসাবে জাতিসংঘে গিয়েছে। ডেপুটি প্রধানমন্ত্রীর চাকরি পাওয়ার পরপরই ইয়াহিয়া তাকে জাতিসংঘে পাঠিয়েছে তার পক্ষ হয়ে বক্তব্য পেশের জন্য।

  ভুট্টো ভাগ্যবান লোক। ইয়াহিয়া জল্লাদ হলেও বেঈমান নয়। সম্ববত সেকারণেই অনেক ঝগড়াফ্যাসাদ, মান-অভিমানের পর আবার জল্লাদে-যুবরাজে মিলন ঘটেছে। শেষ পর্যন্ত বঞ্চিত হয়নি ভুট্টো। দীর্ঘদিন পরে ক্ষমতার কাঁচকলাটার টুকরা একটা অংশ হলেও ইয়াহিয়া ভুট্টোর হাতে তুলে দিয়েছে। তাকে পাঠিয়েছে জাতিসংঘে।..

  বিগত সাড়ে আট মাসে জল্লাদ ইয়াহিয়া বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্নকে বানচাল করার জন্য যে হিংস্র বর্বরতা, যে পাশবিক গণহত্যা, শাঠ্য-ষড়যন্ত্র আর ছন-চাতুরির তস্করসুলভ অভিযান চালিয়েছে, মানব জাতির ইতিহাসে তার কোন নজির নেই। কিন্তু তবু তার উদ্দেশ্য সফল হয়নি। দশ লক্ষ বাঙালীকে হত্যা করে, এক কোটিকে দেশান্তরী করে, অগণিত জনপদ নিশ্চিহ্ন করে, কারারুদ্ধ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার হুমকি দিয়েও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে বানচাল করতে ইয়াহিয়া খান। বরং যতই দিন গেছে, ততই তীব্রতর দুর্জয় দুর্বার হয়ে উঠেছে দুর্ধর্ষ বাঙালী জাতির আক্রমণধারা। মিত্রবাহিনীর সহায়তায় বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা মাতৃভূমিকে সম্পূর্ণভাবে শত্রমুক্ত করতে চলেছেন। দুশমন বাহিনীকে পর্যুদস্ত করে তারা দুরন্ত বেগে এগিয়ে চলেছেন শত্রকবলিত ঢাকার দিকে। বাঙালী জাতি আজ শত্রমুক্ত বাংলাদেশের দ্বারপ্রান্তে।