পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভুট্টোকে পরামর্শ দিলেন পূর্ব বাংলা সম্বন্ধে একটি যুক্তিসম্পন্ন মীমাংসা করতে। শুধু তাই নয়, চীন ইয়াহিয়া-ভুট্টো চক্রের সমস্ত প্রচারণার মুখে পদাঘাত করলেন।
১১ই নভেম্বর B.B.C-র খবরে প্রকাশ, চীন পাকিস্তানকে সংযত হওয়ার জন্য উপদেশ দিয়েছে। চীন বলেছে, “কোন অবস্থাতেই ভারত আক্রমণ করা পাকিস্তানের উচিত হবে না।” শুধু তাই নয়, পাকিস্তান বাংলাদেশ সমস্যাকে ভারত-পাকিস্তান সমস্যার আকারে নিরাপত্তা পরিষদে তোলার আবেদন জানিয়েছিলো। চীন তার সেই আবেদনও প্রত্যাখ্যান করেছে।
চীনের এই কথার অর্থ এই দাঁড়ায়, চীন পাকিস্তান সরকারের কার্যাবলী সমর্থন করতে প্রস্তুত নয় এবং ইয়াহিয়ার রণহুঙ্কারকেও চীন অসার ও অযৌক্তিক মনে করে। সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ সমস্যাকে চীন পাক—ভারত সমস্যা হিসাবে দেখতে রাজী নয়।
এইদিকে মার্কিন সরকারও পাকিস্তানে অস্ত্র বিক্রয়ের লাইসেন্স বাতিল করে দিয়েছে। এর ফলে আজ ইয়াহিয়ার জঙ্গী সরকার সারা বিশ্ব অসহায় এতিমের পর্যায়ে নেমে এসেছে। অন্যদিকে বিশ্ববিবেক সোচ্চার হয়ে উঠেছে স্বাধীন বাংলার মানুষের সপক্ষে। বাংলার দুর্ধর্ষ মুক্তিবাহিনী আঘাতের পর আঘাত হেনে চলেছেন। তাদের ক্ষীপ্রতায় এবং প্রচণ্ডতায় হানাদার বর্বর পাক বাহিনী দিশেহারা।
সেদিনের স্বল্প অস্ত্রে সজ্জিত মুক্তিবাহিনী আজ বিশ্বের সমর্থনপুষ্ট হয়ে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত এবং দুর্ধর্ষ অজেয় বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। তারা প্রস্তুত হচ্ছে চরম আঘাত হানার জন্য, বাংলাদেশের মাটি থেকে শেষ শত্রুটিকেও নিশ্চিহ্ন করার জন্য। জয় আমাদের সুনিশ্চিত। জয় বাংলা।
১৭ নভেম্বর, ১৯৭১
প্রিয় ভাইবোনেরা,
আমার সংগ্রামী অভিনন্দন গ্রহণ করুন।
বিগত প্রায় আট মাসাধিককাল যাবৎ আমরা সবাই মুক্তিসংগ্রামে লিপ্ত আছি। বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এ মুক্তিসংগ্রামে শরীক হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কোরবানী দিয়েছে কোন না কোন ভাবে। মুক্তিযুদ্ধ ও সাধারণ সাম্রাজ্যবাদী বা সম্প্রসারণবাদী যুদ্ধের পার্থক্য এই যে, সাম্রাজ্যবাদী বা সম্প্রসারণবাদী যুদ্ধে দেশের জনসাধারণকে জোর করে যুদ্ধের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়; বেতনভোগী (Mercenary) সৈন্যরা দায়ে পড়ে অথবা পদের লোভে বা প্রয়োজনে যুদ্ধ করতে বাধ্য হয়। আর মুক্তিযুদ্ধে দেশের আপামর জনসাধারণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে শরীক হয়- সুশিক্ষিত, অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত সৈন্যরা দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে শত্রুসেনাকে খতম করার জন্য মাতৃভূমিকে শত্রুকবল হতে উদ্ধারের জন্য যুদ্ধ করে। আমাদের বাংলাদেশের বাহাদুর বেঙ্গল রেজিমেণ্ট, ই-পি-আর, পুলিশ, আনসার ও মোজাহেদ বাহিনী, আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী ও ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এবং বিভিন্ন শ্রমিক সংস্থার সংগ্রাম পরিষদের বাহাদুরেরা প্রথমে এরূপ দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সমরনায়ক ইয়াহিয়া-টিক্কা খানের হানাদার দস্যুবাহিনীর বর্বর আক্রমণ রুখে দাঁড়িয়েছে। দেশের সর্বস্তরের নরনারী, ছাত্র-শ্রমিক-কৃষক-মজদুর তথা আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা নির্বিশেষে পরবর্তীকালে এই চরম সংগ্রামে শরীক হয়েছে- কে সক্রিয়ভাবে, কেহ পরোক্ষভাবে, সক্ষম যুবকেরা অস্ত্রের মাধ্যমে এবং শিল্পী-সাহিত্যিক-কবি-সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবী, বিভিন্ন স্তরের কর্মচারী ও কূটনীতিবিদ সাধ্যমত তাদের নিজ নিজ ক্ষমতা ও প্রতিভার মাধ্যমে। কাজেই একথা বলা ঠিক নয় যে, মুক্তিযুদ্ধ কারও একার কর্তব্য। অবশ্য যুগে যুগে মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে বেঈমান, সুবিধাবাদী, বা ‘কুইসলিং’ ‘মীরজাফরদের’ যেমন ভূমিকা ছিল, আমাদের এই সংগ্রামেও