139
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খণ্ড
বঙ্গবন্ধু শেখ পর্যন্ত Artificial Heart Transplantation করে কোন রকমে জোড়াতালি দিয়ে পকিস্তানের জিইয়ে রাখতে চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু অকস্মাৎ ২৫শে মার্চের গভীর রাতে জেনারেল ইয়াহিয়া–টিক্কাখান-ভুট্টো চক্র বেয়নেটের খোঁচায় পাকিস্তানের অপমৃত্যু ঘটিয়েছে। এর জন্য এককভাবে তারাই দায়ী। তারপর ১০ লক্ষাধিক বাঙালী নরনারী-শিশু-যুবক-যুবতীর-মা-ভাই-ভগ্নির তাজা রক্তস্রোতের অতল তলে পাকিস্তান নিমজ্জিত হয়েছে-ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। এর প্রাণরক্ষা আর সম্ভব নহে। ইসলাম Universal - আল্লাহ সবার। আমরা ‘আলহামদুলিল্লাহি রাবিবল আলামীন’- অর্থাৎ ‘সব প্রশংসা তাহার জন্য যিনি বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করেছেন’....
মোট কথা, ইসলাম Co-existence, Co-havitation ও Compromise-এর ধর্ম। এক কথায় ইসলামের মর্মকথা Secularism-এর মর্মকথা। কাজেই আমরা স্বাধীন বাংলদেশ গড়ে তুলবো এমন এক সমাজব্যবস্থা যা হবে সার্বজনীন- Universal and Secular– যাতে থাকবে হিন্দু-মুসলমান-খৃষ্টান-বৌদ্ধ, জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সমান অধিকার। থাকবে না মানুষে মানুষে কোন বিবাদ-বিচ্ছেদ, কোন ভেদাভেদ। আর আমাদের এই মহান মূলমন্ত্রের হোতা সাড়ে সাত কোটি বাঙালী তথা দুনিয়ার সমস্ত মজলুম বঞ্চিত মানবতার অগ্রনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
ভাগ্যের পরিহাস, তিনি আজ জোনরেল ইয়াহিয়ার কারাগারে আটক, আমরা সাড়ে সাত কোটি বাঙালী সাবধান করে দিতে চাই- বঙ্গবন্ধুর কোন ক্ষতি সাধিত হলে সমগ্র বিশ্ব দাবানলের অগ্নির মত দাউ দাউ করে জ্বলে উঠবে। এখনও সময় আছে জেনারেল ইয়াহিয়া, তাকে এখনও মুক্তি দাও-নচেৎ শুধু তোমার পাকিস্তান নয় অচিরেই তুমিও ধ্বংস হয়ে যাবে। জয় বাংলা।
(আবদুল মালেক উকিল, এম-এন-এ)
অভিজ্ঞতার আলোকে
২৪ জুলাই, ১৯৭১
বাংলার মুক্তি আন্দোলনের যারা রক্ত দিয়েছেন, যারা বিভিন্ন রণাঙ্গনে শত্রুসেনার সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন তাদের উদ্দেশে সশ্রদ্ধ অভিবাদন জানিয়ে শুরু করছি। বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের রায়কে উপেক্ষা করে, গণতন্ত্রের সমস্ত নীতি পদদলিত করে এবং মানবতার সমস্ত শিক্ষাকে মথিত স্বৈরাচারী বিশ্বাসঘাতক পাকিস্তানী বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়েছিল নিরপরাধ নিরস্ত্র বাঙালী জনতার উপর ২৫শে মার্চের রাতে। বাংলার গ্রাম-গ্রামান্তরে সূর্যরশ্মি পৃথিবীর আবহাওয়ায় প্রবেশ করার পূর্বেই প্রচারিত হয়ে গেল এ খবর, পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর নৃশংস কার্যকলাপের ঘটনা। কিন্তু বাংলার মানুষ এবার মরণজয়ী। সামরিক বাহিনীর কামান, ট্যাংক, মর্টার, বিমান ও আরও হাজার ধরনের উন্নত মারণাস্ত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হল তারা। বিপুল বিক্রমে বিশ্বাসঘাতক বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ আরম্ভ হল EPR, পুলিশ বাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর। এ খবরও প্রচারিত হল গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে নিশাবসানের পূর্বেই। সচেতন জনতা বুঝতে পারলো মুক্তি তাদের সোজা পথে আসবে না। স্বাধীনতা তো ভিক্ষে করে পাওয়া যায় না। স্বাধীনতা আদায় করে নিতে হয়। এবং তার জন্য প্রয়োজন হয় রক্তের। জনতার কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হতে থাকলো বঙ্গবন্ধুর বাণী “রক্ত যখন দিতে শিখেছি তখন কেউ আমাদের ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না।” বাংলার বীর জনগণ রুদ্ররোষে বেরিয়ে এল রাস্তায়। কৃষক, মজুর, শিক্ষক, ছাত্র, কর্মচারী ও জনতা অস্ত্র হাতে তুলে নিল। কোটি কণ্ঠ থেকে উচ্চারিত হল রক্তের বিনিময়ে বাংলার মুক্তি আদায় করার দুর্জয় প্রতিজ্ঞা, পরাধীনতার গ্লানির অবসান করার দীপ্ত প্রতিজ্ঞা।