বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র (পঞ্চম খণ্ড).pdf/১৮৯

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
165
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খণ্ড

মালিক নামক জনৈক দালাল দন্তচিকিৎসককে বসানো হয়েছে। বিগত সাধারণ নির্বাচনে জনগণের কাছে পরিত্যাক্ত কতিপয় রাজনীতিককে নিয়ে একটি তথাকথিত বেসামরিক সরকারও খাড়া করা হয়েছে। বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার প্রহসনকে তথাকথিত ‘সুবিচার’ হিসেবে দেখানোর জন্য একজন অনুমোদিত কৌঁসুলি দেয়া হয়েছে। আরো শোনা যায়, মার্কিনী সুপারিশ অনুযায়ীই গঠন করা হয়েছে রাজাকার বাহিনী, দেখানো হয়েছে সাধারণ ক্ষমার প্রহসন।

 বাংলাদেশের মানুষ, সংগ্রামী মুক্তিযোদ্ধারা আর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কেউই এই ধরনের কোন ফাঁদে পা দেননি। সকলের কাছেই এই ধরনের সুকৌশল-চাতুর্যের আসল মতলবটা সব সময়ই ছিল অত্যন্ত পরিষ্কার। এবার তাই মরণোন্মুখ রাখাল বালকটিকে বাঁচানোর জন্য শেষ চেষ্টা শুরু হয়েছে শ্বেতপ্রাসাদ আর ডাউনিং স্ট্রিট থেকে। যে সংস্থা বাংলার লাখ লাখ মানুষ হত্যার, গণহত্যার অভিযোগ শুনতে চায়নি, জল্লাদ দলের অত্যাচারে পৈত্রিক ভিটেমাটি থেকে উৎখাত হয়ে বিদেশে আশ্রয়গ্রহণকারী প্রায় এক কোটি মানুষের আকুল আবেদন যাদের কর্ণকুহরে প্রবেশ করেনি, তাদের নতুন যেকোন চক্রান্ত বাংলার মানুষ বানচাল করে দেবে। হানাদার বাহিনীকে চিরতরে খতম করে দিয়ে বাংলার স্বাধীনতার সূর্যকে অম্লান অক্ষয় রেখেই সাড়ে সাত কোটি বাঙালী এই নতুন চক্রান্তের দাঁতভাঙ্গা জবাব দেবে।

১০ ডিসেম্বর, ১৯৭১

 স্বস্তি পরিষদ বা সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে চীনের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা মার্কিন চক্রান্ত একের পর এক চলতে থাকলেও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ এখন একটি প্রতিষ্ঠিত সত্য। এটা অস্বীকারের অর্থ সকালের নবীন সূর্যের আলোকরশ্মি থেকে নিজেকে বঞ্চিত করা। নিরাপত্তা পরিষদে ব্যর্থ হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাধারণ পরিষদে কতিপয় পেটুয়া রাষ্ট্রের সাহায্যে এবং চীনের সহযোগিতায় বাংলাদেশ তথা ভারতের বিরুদ্ধে একটি প্রস্তাব পাস করিয়ে নিয়েছে। আর তাদের সাথে এ ব্যাপারে ভিড়ে গেছে ইসলামের বেশধারী কতিপয় ইসলামপন্থী রাষ্ট্র। কিন্তু জাতিসংঘে যত তাড়াহুড়ো করেই তারা প্রস্তাব পাস করুক না কেন বাংলাদেশের পিণ্ডির জল্লাদ দলের বিরুদ্ধে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর দুর্বার অভিযান তাতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাগ্রস্ত হবে না। জাতিসংঘের ফরমান বাংলাদেশে পৌঁছানোর আগেই পাকিস্তানী হানাদারদের প্রতিরোধের সকল প্রাচীর ধসে পড়বে, এটা এখন প্রায় সুনিশ্চিত। সত্যি কথা বলতে কি, জাতিসংঘ নামক ঠুঁটো জগন্নাথকে রবার স্ট্যাম্প হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে আর পাচ্ছে না বা এ সুযোগ তাদেরকে দেয়া হবে না। বাংলাদেশের আকাশে স্বাধীনতার যে সূর্য আজ আপন মহিমায় বিকশিত হয়েছে তাতে কলঙ্কিত করার মওকা পাক-দোস্ত চীন বা পিণ্ডির মহাপ্রভু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা তাদের রবার স্ট্যাম্প জাতিসংঘ পাবে না।

 বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের যে সংগ্রাম শুরু করেছেন মহান গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের কূটনৈতিক স্বীকৃতির পর তা আজ এক নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। মুক্তাঞ্চলে নবজীবনের রূপায়নের মহান দায়িত্ব আজ মুক্তিসংগ্রামী সকলের উপর বর্তেছে। তারাই আজ স্বাধীন বাংলাদেশে সুখী শোষণহীন গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার নকিব। এজন্যই প্রথমে মনে রাখা দরকার, আমাদের এই স্বাধীনতা সংগ্রামের পটভূমি ও মূলনীতির কথা। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী জনাব তাজউদ্দীন আহমদ তাদের সাম্প্রতিক বেতার ভাষণে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় স্বাধীন বাংলার অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের মূলনীতি জানিয়ে দিয়েছেন। এই নীতির ভিত্তি হলো ধর্মনিরেপক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র। তারা বলেছেন, মানুষের উপর মানুষের শোষণের নীতিতে আমরা বিশ্বাসী নই। ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার অর্থনৈতিক ব্যবাধানের অবশ্যই বিলোপ সাধন করতে হবে। আজ তাই এমনভাবে সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থাকে পুনর্গঠিত করতে হবে, যাতে বাংলাদেশের মেহনতি মানুষ উপকৃত হয়। যাতে শ্রমিক-কৃষক পায় সকল সুযোগ-সুবিধা তাদের জীবনযাত্রার পুনর্বাসনের জন্য।