বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র (পঞ্চম খণ্ড).pdf/২৪০

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।

216 বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড বাংলার মুখ ২২ নভেম্বর, ১৯৭১ হেমন্তের সন্ধ্যা দ্রুত নেমে এলো। আমরা এখানে এসে পৌঁছুনোর অপেক্ষাতেই যেন সে বসেছিলো। এসে পৌঁছুনোর সঙ্গে সঙ্গে তুরা পড়ে গেল। আমার চার পাশে, সমুখের ওই বিস্তীর্ণ মাঠের ওপর আর এই দূরের গ্রামগুলোর কোলে ঘেষে ঘেঁষে নীল ধোঁয়ার মতো কুয়াশারা জমে উঠেছে। চাপা কান্নায় ভেজা দৃষ্টির মতো হালকা কুয়াশার জমে উঠেছে ঢাকার উপকণ্ঠের এই বনানীর প্রান্ত ছুয়ে ছুয়ে। একটু আগেই আমরা এই ছোট্ট উপবনটিতে এসে পৌঁছেছি। আমাদের সঙ্গে বেশ কিছু জিনিসপত্র মেশিনগান। এ সবই আমরা পেয়েছিলাম শালদা নদীর তীরে পাকিস্তানী-সৈন্যদের বেলুচ রেজিমেন্টের ১০৩ ব্রিগ্রেডের একটা কোম্পানীর সঙ্গে প্রচণ্ড এক লড়াইয়ের পর। এই লড়াইয়ে শত্রপক্ষের ১৪৩ জন নিহত হয়েছিল। আর আমাদের পক্ষে একজন বীর মৃত্যুবরণ করেছেন এবং তিনজন আহত হছেন। শালদা নদীর তীরের এই লড়াইকে আমরা আমাদের কোন বড়রকম বিজয় বলে মনে করি না। কারণ এ লড়াইয়ে আমাদের একজন মুক্তিসেনারও আহত হওয়ার কথা ছিল না। এই লড়াইয়ে আমাদের গেরিলা বাহিনীর যে ইউনিটটি অংশগ্রহণ করেছিলো তারা প্রত্যেকেই ছিলেন সুশিক্ষিত, অধিকাংশই কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা ছাত্র। আমাদের আক্রমণ অভিযানের পরিকল্পনাটিও ছিলো নিখুঁত। পরিকল্পনা অনুযায়ী শত্রবাহিনীর প্রতিটি সৈন্য নিহত হবার কথা ছিলো। কিন্তু ওদের কয়েকজন পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। এ নিয়ে আমাদের মধ্যে বেশ গরম আলোচনা হয়েছে, আমাদের সামান্যতম ভুলত্রটি ও শিথিলতার কঠোর সমালোচানাও করা হয়েছে। কিন্তু যে কথা বলছিলাম, আমরা পাঁচজন মুক্তিসেনা সঙ্গে করে যেসব অস্ত্রশস্ত্র এনেছি ওজনে বেশ ভারী ছিলো। আমাদের এক-একজনের ওজন প্রায় দ্বিগুণ হয়ে উঠেছিলো। এগুলো পিঠে-কাঁধে ঝুলিয়ে একটানা বেশ কয়েক ঘণ্টা আমাদের হাঁটতে হয়েছে। হাঁটতে হয়েছে নদীতীরের বালুকারাশির ওপর দিয়ে, মাঠের ওপর দিয়ে, মাঠ পেরিয়ে জলাভূমি ভেঙে ভেঙে। আবার কখনো হেঁটেছি ছবির মতন শান্তস্নিগ্ধ ছোট ছোট সব গ্রাম আর ক্ষেতের মাঝ দিয়ে দিয়ে। স্বাভাবিকভাবেই বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। পিঠে আর কাঁধের বোঝা নামিয়ে আমার সর্বক্ষণের সঙ্গী হাতিয়ারটা নিয়ে অপেক্ষাকৃত হালকা একটা ঝোপের পাশে এসে বসলাম। সঙ্গীরাও আমার পথ অনুসরণ করলো। এই উপবনটিতে এসে পৌছুনোর পরমুহুর্ত থেকেই একটা পাখির ডাকের জন্যে আমি উৎকর্ণ হয়ে ছিলাম। বাংলাদেশের এমনি সব বন-উপবন মুখর করা একটি অত্যন্ত পরিচিত পাখির ডাক। সৌভাগ্যক্রমে আমাকে বেশীক্ষণ উৎকর্ণ হয়ে থাকতে হলো না। কয়েক মিনিট পরেই শুনতে পেলাম আমাদের সেই আকাংক্ষিত পাখির ডাক। সঙ্গে সঙ্গে আমাদের পাঁচজন সঙ্গীত একজনের কণ্ঠে সে ডাক প্রতিধ্বনিত হলো। একটু পরেই দেখতে পেলাম তিনজন শীর্ণকায় লোক। গ্রামের সাধারণ ক্ষেতমজুর ছাড়া তাদের আর কিছু মনে করা সম্ভব নয়। এদের আগে কখনও দেখিনি। এরা তিনজনই ভয়ংকরভাবে রোগা। এদের বুকের পাঁজরের হাড়গুলো মাঠের বা গ্রামের খাল-নালার ওপরকার বাঁশের সাঁকোর মতো উচু উচু। এরা তিনজনেই আমাদের গেরিলা বাহিনীর অত্যন্ত দক্ষ সৈনিক। আগে ইপিআর প্যারামিলিটারী গ্রুপে কাজ করতেন। তাদের সঙ্গে আমরা অতিদ্রুত প্রয়োজনীয় আলোচনা সেরে নিলাম। আজ রাতেই এই এলাকা আমরা ছেড়ে যাবো। যাবো-ঢাকা শহরের একেবারে কেন্দ্রস্থলে, শত্রবাহিনীর চেকপোষ্টগুলোর কাছাকাছি। ওই তিনজনের