বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র (পঞ্চম খণ্ড).pdf/২৬৫

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।

241 বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খন্ড বেনামীতে কফিন সাপ্লাইয়ের ঠিকাদারী নিয়ে বেশ টু-পাইস কামাতে শুরু করেছে। আর কামাইয়ের এই নতুন রাস্তাটা যাতে চালু থাকে, নতুন নতুন লাশ সরবরাহের রাস্তাটাও তারা তৈরী করে রেখেছে। মৃত্যুর এই ঠিকাদাররা সহজে তো আ এমন লাভের কারবার ছাড়তে পারে না? পশ্চিম পাকিস্তান থেকে যেসব তরতাজা জল্লাদ আমদানী করা হয়েছে মুক্তিবাহিনীর কবল থেকে, তাদের তো আর বিদেশে জ্যান্ত ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে না। তাদের লাশগুলো কফিনের বাক্সে পুরে তাদের স্বদেশে পাঠানো হবে। বলিহারী আশা। বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধকে যখন এই জল্লাদরা নির্বিচারে হত্যা করেছে, পুড়িয়ে মেরেছে, নৃশংস হত্যার নব নব কৌশল উদ্ভাবন করে চরম নির্যাতনের ভেতর দিয়ে হত্যা করেছে, তখন তারা এদেশের সেই শহীদদের দাফনের কথা ভাবেনি, মৃত্যুর পরে তাদের কবরে ঠাঁই মেলেনি। পথে-ঘাটে-ভাগাড়ে এদেশের বাপ, মা-ভাই, বোনের মৃতদেহ পড়ে থেকে পচেছে, শেয়াল-শকুনের খোরাক হয়েছে- কবরের কোলে তাই ঠাই দেয়া হয়নি, ইয়াহিয়ার জল্লাদরা সে সুযোগটুকুও দেয়নি। নিরপরাধ সদ্য বিবাহিত হারুনকে হত্যা করে ঠাটারী বাজারের পথের ওপারে ফেলে গিয়েছিল জল্লাদরা। হুকুম দিয়ে গিয়েছিল চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে কেউ সেই লাম ছুতে পর্যন্ত পারবে না। তেমনি পড়ে থেকেছে যুবক হারুনের মৃতদেহ, ঠাটারী বাজারের পথের ওপরে। জল্লাদদের জীপ বার বার সেই মৃতদেহের ওপর দিয়ে গিয়েছে, এসেছে। আর দানবীয় তুলে নিয়ে গিয়ে ফেলে এসেছে ভাগাড়ে। এ ইতিহাস শুধু এক হারুনের ইতিহাস নয়। ইয়াহিয়ার জল্লাদদের হাতে নিহত বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ বাবা-মা, ভাই-বোনকে তারা শেয়াল-শুকুনের খোরাকে পরিণত করেছে। তাদের সে আশা পূরণ হবার নয়। বাংলাদেশের মানুষ, বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী জল্লাদদের কাউকেই স্বদেশের মাটিতে যেতে দেবে না- জ্যান্ত অথবা মৃত কোন অবস্থাতেই না। এই বাংলাদেশের মাটিতেই নির্বান্ধব জল্লাদের অন্তিমশয্যা রচিত হবে। কফিনের বাক্স যেমনকার তেমনি পড়ে থাকবে। অনেক বিলম্বে হলেও এই অনিবার্য পরিণতির কথা জল্লাদদের প্রভুরা বোধ হয় কিছু কিছু অনুমান করতে পারছে। তাই তাদের এবং তাদের ভাড়াটিয়াদের কণ্ঠে ইদানিং যেন দরদের বান ডাকছে। তাই তারা বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর তরুণদের উদ্দেশে ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদুনী গাইছে। আহা, কুলোকের কুপরামর্শে বাংলাদেশের এইসব সরল-নিরীহ ছেলেরা না-হক প্রাণ দিচ্ছে। ওহো, কি দুঃখের কথা! একেই বলে গরুর শোকে শুকনের কান্না। বাংলাদেশের তরুণদের জন্যে জল্লাদ ইয়াহিয়া গোষ্ঠী আর তার দালালদের কি দরদ। বলি বেহায়া খান, বাং র এই তরুণদের, তাদের মা-বাপ, ভাই-বোনকে কিভাবে তোমরা হত্যা করেছো। সে কথা আমরা ভুলে যাব ভেবেছ? ভুলে যাব ভেবেছ মা-বোনের সন্ত্রমহানির কথা? তোমরা ঘাতকরা হঠাৎ এক-একটা জায়গা ঘেরাও করে শিশু-কিশোর-যুবকদের ট্রাকে উঠিয়ে পাগলায় নিয়ে গিয়ে বেয়নেট দিয়েছো। শিশু-কিশোর-যুবকদের চোখ বেঁধে ট্রাকে তুলে নিয়ে গিয়ে তাদের দেহ থেকে নিঃশেষ রক্ত শুষে নিয়ে হত্যা করেছ তোমরা। তারপর ফেলে এসেছ ভাগাড়ে। শকুনে শকুনে সেখানকার আকাশ ছেয়ে গিয়েছিল। আজ তোমাদের কণ্ঠে দরদের বান ডাকছে। তোমরা বেহায়া, তোমরা পশুরও অধম, দানবের চেয়েও নৃশংস।