বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র (পঞ্চম খণ্ড).pdf/৯৮

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
74

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ পঞ্চম খণ্ড

 মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একজন ঝানু আণ্ডার সেক্রেটারী ও প্রাক্তন রাষ্টদূত মিঃ চেষ্টার বোলস শেখ মুজিবুর আদালতে শেখ মুজিবুর রহমানের যে গোপন বিচার চালাচ্ছে তা আগাগোড়া একটি প্রহসন মাত্র। পাকিস্তানী সামরিক জান্তার এটা একটা চরম ধৃষ্টতা। এ বিচার সকল রীতিনীতি ও আইন-কানুনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

 মিঃ চেষ্টার বোলস পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সম্পর্কিত যুক্তরাষ্ট্র সরকারের বর্তমান নীতির কঠোরতম সমালোচনা করেন। মার্কিন সরকার পাকিস্তান সরকারকে যে সামরিক সাহায্য অব্যাহতভাবে দিয়ে চলেছে, মিঃ চেষ্টার বোলস তাকে “চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা ও নীতিবিগর্হিত” বলে বর্ণনা করেছেন।

 সম্প্রতি ওয়াশিংটন পোষ্ট’-এ তাঁর একটি তথ্যপূর্ণ প্রবন্ধে মিঃ চেষ্টার বোলস বলেনঃ পাকিস্তানের ফ্যাসিবাদী সরকারকে সাহায্য করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এক চরম ভুল করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে অতীতের সব ভুলত্রটি সংশোধন করে পাকিস্তানের কাছে সামরিক অস্ত্র ও সমরসম্ভার বিক্রয় সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা এবং পাকিস্তানকে সর্বপ্রকার অর্থনৈতিক সাহায্য দান একেবারে বন্ধ করে দেবার আহবান জানান।

 পরলোকগত মার্কিন প্রেসিডেণ্ট জন এফ কেনেডীর সহোদর সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডী বাংলাদেশে পাক হানাদার বাহিনী সৃষ্ট মানব ইতিহাসের চরম বিপর্যয় ও মানব ইতিহাসের সবচে কলঙ্কজনক অধ্যায় নিজের চোখে দেখে যাবার জন্যে বাংলাদেশের শরণার্থীদের শিবিরগুলো পরিদর্শন করে গেছেন। তিনি পাক অধিকৃত বাংলাদেশেও যেতে চেয়েছিলেন কিন্তু পাক বাহিনীর বর্বরতা পাছে পুরোপুরি ফাঁস হয়ে যায় সেজন্যে পাকিস্তানী সামরিক সরকার তাঁকে পাকিস্তানী বর্বর বাহিনী অধিকৃত বাংলাদেশে যাবার অনুমতি দেয়নি। শুধুমাত্র সীমান্তে দাঁড়িয়ে ও শরণার্থীদের শিবিরগুলো পরিদর্শন করে তিনি যা দেখেছেন এবং যে মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা হয়েছে তা থেকেই তিনি বলেছেনঃ পাকিস্তানী সৈন্যরা যে বাংলাদেশে গণহত্যা চালিয়েছে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

 মার্কিন সিনেটের উদ্বাস্তু বিষয়ক কমিটির সভাপতি সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডী বলেনঃ পাকিস্তানী সামরিক জান্তার কাছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একমাত্র অপরাধ হলো তিনি নির্বাচনে জয়লাভ করেছেন। তাঁর বিচার আন্তর্জাতিক আইনের দিক থেকে বিচারের ব্যাভিচার এবং ন্যায়বিচারের প্রহসন মাত্র।

 আদ্দিস আবাবা বেতার থেকে প্রচারিত এক খবরে বলা হয়ঃ রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তির ব্যাপারে সাহায্য করার জন্যে গঠিত আন্তর্জাতিক সংস্থা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির জন্যে সারাবিশ্বে এক প্রচার অভিযান শুরু করবে।

 বিশ্ব জোড়া এই বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সত্ত্বেও পাকিস্তানী সামরিক জান্তা শেখ মুজিবুর রহমানের গোপন বিচার প্রহসন অব্যাহত রেখেছে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ এই প্রহসন মেনে নেয়নি। আজ বাংলাদেশের অধিকৃত এলাকার সর্বত্রই চলছে পাক হানাদার নিধনের দুর্বার অভিযান। মুক্তি বাহিনীর বীর যোদ্ধারা বাংলাদেশের পুণ্যভূমি থেকে হানাদারদের সমানে উৎখাত করে চলেছে। বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ আজ হানাদার উৎখাতে বদ্ধপরিকর।

১৯ আগষ্ট, ১৯৭১

 ...পাকিস্তানের সাবেক এয়ার মার্শাল আসগর খান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার প্রহসনে তীব্র নিন্দে করেছেন। এই বিচার প্রহসনের কঠোর সমালোচনা করে তিনি পাকিস্তানী সামরিক চক্রকে এই বলে হুশিয়ার করেছেন যে, পাকিস্তানী সামরিক জান্তা বাংলাদেশে যা করছে এবং বঙ্গবন্ধুর বিচার প্রহসনে মেতে যা করতে যাচ্ছে তার পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ এবং এর ফলে পাকিস্তানটাই তাসের ঘরের মতো এক মুহুর্তে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়বে।