পাতা:বাখতিন - তপোধীর ভট্টাচার্য.pdf/১০১

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

বিকল্প হিসেবে তিনি অভিন্ন চিন্তাবীজের প্রস্তাবনা করেছিলেন। মার্ক্সীয় নন্দনতত্ত্বের বিরোধিতা করার উদ্দেশ্যে নয়, তাকে আরও সংহত পরিশীলিত ও পূর্ণতর করে তোলার জন্যে বাখতিন লোকসমাজের অনাবিল জীবনপ্রবাহে নিহিত প্রতিরোধ ও বিকল্পয়ানের অমিত শক্তির প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। প্রান্তিকায়িত অপর পরিসরের সমবায়ী উপস্থিতিকে স্বীকৃতি ও মর্যাদা দেওয়ার জন্যেই সোভিয়েত রাষ্ট্রব্যবস্থা পত্তন হয়েছিল। সমাজতান্ত্রিক পুনর্নির্মাণের পর্যায়ে এই অপর পরিসর নিরবিচ্ছিন্নভাবে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগ্রাম পরিচালিত করে কর্তৃত্ববাদের শেষ প্রচ্ছায়াও মুছে নেবে, এই ছিল ঈপ্সিত। কিন্তু রাজনৈতিক সংগঠন ও রাষ্টের সমীকরণ যদি সম্পন্ন না হয়, অপর পরিসরের ঐতিহাসিক ভূমিকাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করাই হবে ইতিহাসের কাছে দায় পালন। কার্নিভালের হাসি-শ্লেষ-কৌতুকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শুদ্ধীকরণের নিষ্কর্ষই আজ লক্ষ করতে হবে আমাদের। তাই আবারও লিখছি, বাখতিনের মতো অনন্য মানুষ প্রচ্ছন্ন ভাবেও ব্যক্তিগত বৌদ্ধিক প্রতিশোধ স্পৃহা মেটানোর জন্যে কোনো কিছু করতে পারেন না। তাছাড়া তাঁর লিখনবিশ্ব কিংবা চিন্তাবিশ্বের সরলীকৃত ব্যাখ্যা বা তাদের সম্পর্কে পূর্বনির্ধারিত ধারণার নিরিখে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর অর্থ হলো বাখতিনের প্রতি চরম অবিচার।


পাঁচ

প্রতীচ্যের দুর্ধর্ষ পণ্ডিতেরা যেহেতু এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থায় বৌদ্ধিক সেনাপতি, বাখতিনের চিন্তাপ্রণালী থেকে বৈপ্লবিক নিষ্কর্ষ মুছে নেওয়ার জন্যে তাঁদের আগ্রহ স্বাভাবিক। সমস্যা হলো, তাঁদের বিশ্লেষণের পেছনে যে সাংস্কৃতিক রাজনীতি রয়েছে—সে-বিষয়ে অভিনিবেশ না-দিয়ে অনেক প্রগতিপন্থী আলোচক (প্রতীচ্যে এবং এদেশে) বাখতিনকে খারিজ করতে চান। কার্নিভালের তত্ত্ববীজ যেহেত প্রান্তিকায়িত বর্গের সাহসী প্রত্যাঘাত বলে বিবেচিত হতে পারে, এর অপব্যাখ্যা সবচেয়ে বেশি হয়েছে। বাখতিন কেন লোকসমাজকে জগৎসম্পর্কিত দ্বিতীয় (অর্থাৎ বিকল্প) সত্যের ভাণ্ডারী বলেছেন, এর তাৎপর্য গভীরভাবে বিবেচনা করতে হবে। হলক্যুইস্টের মতো প্রসিদ্ধ বিশেষজ্ঞ কেন বাখতিনের কার্নিভাল সম্পর্কিত বিশ্লেষণে ‘a strong element of idealization, even utopian visionariness’ (১৯৮৪: ৩১০) দেখতে পান—তা বোঝা খুব একটা শক্ত নয়। যিনি সমাজতান্ত্রিক পুনর্গঠনের দ্বান্দ্বিক সংগ্রামকে তাচ্ছিল্যসূচক চিহ্ন (ঊর্ধ্বকমাযুক্ত struggle: তদেব) দিয়ে উপস্থাপিত করেন, লোকসমাজের সমৃদ্ধ সাহিত্যিক বয়ানকে নস্যাৎ করার জন্যে তিনি বাখতিনের দৃষ্টিভঙ্গিকে আদর্শায়িত বলবেন—এটাই স্বাভাবিক। তাঁর মতে, ‘Bakhtin consistently idealises the folk as an untamable, rebellious, and regenerative force that will destroy the status quo, but from the ashes will rise newer and finer worlds.’ (তদেব: ৫১০-৫১১), এমন যদি ভেবে থাকেন বাখতিন, তাকে বিশেষজ্ঞ ‘আদর্শায়ন’ বলে লঘু করছেন কেন? স্থিতাবস্থা যেহেত চিরকাল আধিপত্যবাদের স্বার্থরক্ষার পক্ষে সহায়ক, কার্নিভাল তো সেখানেই আঘাত করবে। আর এটাই তার ‘রাজনৈতিক’ অন্তঃসার। বহু শতাব্দীব্যাপী শোষণ রুশ সমাজকে

৯৭