পাতা:বাখতিন - তপোধীর ভট্টাচার্য.pdf/১০৪

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

and every one participates because its very idea embraces all the people.’ (১৯৮৪: ৩০০)। অর্থাৎ প্রান্তিক পৌরসমাজে কার্নিভাল-চেতনা সর্বত্র ও সর্বদা উপস্থিত। কোনো-একটি নির্দিষ্ট উৎসবে তাই তা সম্পৃক্ত নয়।

 বিস্ময়বোধ সৃষ্টির নিত্যনবায়মান ক্ষমতা কার্নিভালের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। এই বিস্ময়ের প্রবল শক্তিতে তা আস্তিত্বিক অনেকার্থদ্যোতনার বার্তা বয়ে আনে। সরকারি বয়ানে বিস্ময়ের কোনো অবকাশ নেই। চিরন্তন, অবিচল, চরম, অপরিবর্তনীয় প্রভৃতি বর্গের মধ্যে লোকমন শুধু পীড়নের অজুহাত খুঁজে পায়। তাই কার্নিভালের হাসি দিয়ে এইসব ধারণায় হস্তক্ষেপ করে পরিবর্তন-পুনর্নবায়ন-মুক্তি-চূড়ান্তহীনতার আনন্দকে চিন্তাপ্রণালীতে ও প্রতিবেদনে প্রতিস্থাপিত করে। রাবেলের ভাববিশ্ব থেকে সূত্র নিয়ে বাখতিন কার্নিভালের যে-সমস্ত অনুষঙ্গকে নতুন ভাবে বিশ্লেষণ করেছেন, তাদের মধ্যে সময়ের প্রকল্প সম্পর্কিত ধারণা লক্ষ করার মতো। সময়ের নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ আধিপত্যপ্রবণ ভাবাদর্শসমূহ যেসব অনমনীয়, নিয়মতান্ত্রিক ও রুদ্ধ পরিসর ঐতিহাসিক আকল্পদের আরোপ করে থাকে—কার্নিভালের সময়-ভাবনা তা থেকে আমাদের মুক্তি দেয়। কিন্তু এর মানে এই নয় যে এতে নেতিবাচক পলায়নমনস্কতা নিহিত রয়েছে। কেননা কার্নিভাল অনাবিল ও সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা দিয়ে সময়কে পুনরুজ্জীবিত করতে চায় এবং ইতিহাসকেও মুক্তি দেয় আরোপিত আকরণের প্রতি অনুগত্য থেকে।

 বাখতিনের কার্নিভাল-মূলক ভাবনা নিঃসন্দেহে আমাদের সাহিত্যিক ও সামাজিক প্রতিবেদনের নতুন পাঠে প্রাণিত করে। সার্থক উপস্থাপনায় কীভাবে প্রচ্ছন্ন থাকে বহুরৈখিকতা ও অজস্র অন্তর্বয়ন, তা আবিষ্কারের নতুন নতুন পথ আমরা খুঁজে নিতে পারি। শুধু সরকারি ও বেসরকারি ভাবাদর্শের গ্রন্থনাই নয়, আমরা লক্ষ করতে শিখি বাচনের প্রকাশ্য ও প্রচ্ছন্ন দ্বিরালাপের উৎস ও বিস্তারের পটভূমিও। নানা ধরনের আততিপূর্ণ উপন্যাসের বয়ানেও খুঁজতে শিখি কার্নিভালের লোকায়তদ্যুতি, শ্লেষ-পরিহাসের প্রতিভাবাদর্শ ও প্রতিসন্দর্ভের প্রত্যাঘাত। আরোপিত আভিজাত্য সম্পর্কে প্রশ্ন করতে শিখি আমরা, প্রতাপ-পীড়ন-কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মধ্যে অনুভব করি লোকায়ত পৌরুষের উপস্থিতি। অতি সাম্প্রতিক আধুনিকোত্তর পৃথিবীতে প্রতীত বাস্তবতা ও অধিপরিসরের গ্রন্থনা যখন এককেন্দ্রিক বিশ্ব-ব্যবস্থার পরাক্রান্ত সাংস্কৃতিক রাজনীতিকে অনতিক্রম্য করে তুলেছে—অতিপরিশীলিত বিজ্ঞাপনের মাদকে প্রতিষ্ঠিত সত্যের একমাত্র দখলদারদের (‘sole possessor of truth’) প্রতিস্পর্ধা জানাতে পারে বাখতিনের কার্নিভাল-তত্ত্ব। শুধু তত্ত্ব হিসেবে নয়, প্রায়োগিক সামর্থ্যের জোরে। বিশ শতকের একজন বিখ্যাত সমাজনির্মাতা শতফুল বিকশিত হওয়ার সামূহিক স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই মানুষটি আরো বলেছিলেন, ক্ষমতার সদরদপ্তরে কামান দাগতে হবে। কার্নিভাল-ভাবনায় তাঁর এই দুটি কথাই প্রবলভাবে প্রাসঙ্গিক। বর্তমান দুনিয়ায় প্রতাপ-মদমত্তদের অতিকেন্দ্রিকতার পর্যায়েও অসংখ্য জনগোষ্ঠীর সমান্তরাল পুষ্পায়নে এবং প্রান্তিকায়ত পরিসর থেকে তুলে-আনা নিরন্তর প্রত্যাঘাতের শক্তিতে সার্থক হতে পারে কার্নিভালের সাংস্কৃতিক যুদ্ধ। বলা ভালো, হতে পারে নয়, হয়ে চলেছে।

১০০