পাতা:বাখতিন - তপোধীর ভট্টাচার্য.pdf/১১০

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

সর্বগ্রাসী ক্ষুধা নিয়ে ফুটে উঠতে থাকে অক্ষরের সারি; এদের ইচ্ছামতো কমিয়ে-বাড়িয়ে দুমড়ে-মুচড়ে তৈরি হতে থাকে চরম নমনীয় নব্যপাঠকৃতি। অক্ষরের বিন্যাস-পদ্ধতি তো নয় কেবল, চরিত্রও আমূল পালটে যাচ্ছে। স্বভাবত বাচনও আগের মতো থাকতে পারে না। উপস্থাপনায় এমন উন্মুক্ততা দেখা দিচ্ছে, সংরূপে ও অন্বিষ্ট লক্ষ্যে ই-মেল নেটওয়ার্কিং হাইপারটেক্সট নিয়ে আনছে আমূল পরিবর্তন। বাখতিনের কাছে পাওয়া সংযোগের সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কিত তত্ত্ববীজ কি সর্বব্যাপ্ত বিয়োগপর্বের বিভ্রম ও অবভাসে হারিয়ে যাবে? প্রত্যুত্তরযোগ্যতার দার্শনিক নিষ্কর্ষ ও প্রাসঙ্গিকতা কি বজায় থাকবে এখন! লিখনভ্রম লিখনকে আর অধিপরিসরের উচ্চারণ-বিভ্রম উচ্চারণকে মুছে ফেলবে ক্রমাগত? বাখতিন মৌখিক সংযোগ-প্রকরণকে যেভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন তারই আদলে হয়তো বা এইসব অধিপাঠগুলিকে বিশ্লেষণ করার মতো তাত্ত্বিক বয়ান তৈরি করে নেওয়া যায়—এমন ভেবেছেন সাম্প্রতিক এক আলোচক। বাঙালির ভাববিশ্বে এই পর্যায়ের সূচনামাত্র হয়েছে। অন্তত প্রতীচ্যের বৌদ্ধিক সমাজের সঙ্কট এখনও আমাদের কাছে তত প্রত্যক্ষ হয়ে ওঠেনি। তবু, বদ্রিয়ারের পরিভাষায় এই ভবিষ্যৎ অতীতের ছবি আমাদের পক্ষে হতে পারে আগাম সতর্কীকরণ। আর, সেই সঙ্গে সংকট-জনিত পরিবর্তিত পরিস্থতিতে বাখতিনের সময়োপযোগী পুনঃপাঠও শুরু করা যেতে পারে।

 সাহিত্য-সমালোচনা ও সাহিত্যকৃতি সম্পর্কিত যত দার্শনিক ভাবনা সাম্প্রতিক কালে আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে, তাদের মধ্যে বাখতিনের দ্বিবাচনিকতা তত্ত্ব অতিসাম্প্রতিক কম্পিউটার প্রযুক্তির ফলে সৃজ্যমান বয়ানের বৈপ্লবিক রূপান্তরকে সবচেয়ে ভাল ব্যাখ্যা করতে পারে। কোনো সন্দেহ নেই যে বিশ শতকের অন্তিম প্রহরে আমরা একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছি; মুদ্রণযুগের স্থিতিশীল পাঠকৃতিগত অভিব্যক্তির স্থান দ্রুত দখল করে নিচ্ছে ইলেকট্রনিক সাক্ষরতার অভিনব প্রবণতা ও যুগোপযোগী গতিশীল বয়ান। বাখতিনের ভাষা-ভাবনা শব্দের মৌখিক উৎসের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছিল; কিন্তু তা আশ্চর্যজনক ভাবে আজকের ইলেকট্রনিক সাক্ষরতা ও পাঠকৃতির গতিশীল অভিব্যক্তিকে বোঝার মতো চিন্তাসূত্র আমাদের যোগান দিতে পারে। কোনো কোনো আলোচক ইদানীং ‘Digital dialogics’-এর কথাও বলতে শুরু করেছেন। এটা ঠিক যে বস্তুবিশ্ব সাহিত্যিক বাচনের উৎকর্ষ-সূত্রে চিহ্নবিশ্বে রূপান্তরিত হচ্ছিল। বিশ শতকের শেষে তাত্ত্বিক আলোচনায় বিষয়টি তাই ক্রমশ বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। প্রযুক্তির অভূতপূর্ব বিশ্বায়নের সাম্প্রতিক পর্যায়ে চিহ্নায়কের আগ্রাসন তীব্রতর হয়ে চিহ্নায়িতকে কীভাবে গ্রাস করতে বসেছে—তাও আমরা লক্ষ করেছি। বস্তুবিশ্ব কার্যত বিভ্রমবিশ্বে পরিণত হওয়ার ফলে সাহিত্যিক বাচনেও তার অনিবার্য প্রভাব পড়েছে।

 আধুনিকোত্তর কবিতায় প্রতি-উপন্যাসে প্রতি-গল্পে বয়ানের সংরূপ অন্তর্ঘাতের তোড়ে বিদীর্ণ হয়ে যেতে দেখেছি। বাস্তব যখন অধিবাস্তবে কিংবা পরিসর অধিপরিসরে লীন হয়ে যায়, বাচনের বোধ ও দ্বিবাচনিকতার আশ্রয় আমূল রূপান্তরিত না হয়ে পারে না। নির্মাণবায়িত সমাজে প্রযুক্তির বিস্ফোরণে অজস্র চিহ্ন যে উৎপাদিত হয়ে চলেছে—কার্যত তা তো অবভাস। আসলে যা ঘটছে, তা হলো নিশ্চিহ্নায়নের সন্ত্রাস। বাস্তব এখন প্রতীত (virtual) মাত্র। বাখতিনীয় ভাবকল্পগুলিকে প্রয়োগ করতে হলেও অত্যন্ত সতর্কতা ও বিচক্ষণতা প্রয়োজন। আসলে শুধু বাংলা সাহিত্যই নয়, মানুষের পার্থিবতা ও সেই

১০৬