পাতা:বাখতিন - তপোধীর ভট্টাচার্য.pdf/৩৯

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

পারে সব। কিংবা, বাখতিনের চিন্তাসূত্র অনুযায়ী, উঠতে পারে নয়—বলা ভালো, হয়ে উঠবে। স্মৃতি আমাদের সত্তার সূত্রধার, সত্তা যেমন ভবিষ্যতের। চলতে-চলতে পুঞ্জীভূত হতে থাকে কত অজস্র বিস্তৃতির নিঃশব্দ আয়তন, কোনো-এক অদূরবর্তী ভবিষ্যতে পুনর্জীবিত হবে বলে। বাখতিনও তাই জীবনের গোধুলিবেলায় পৌঁছে ফিরিয়ে এনেছিলেন বিস্মৃত তারুণ্যের ভাবনা; আসলে এভাবে, ভাবনার পুনর্নবায়নের মধ্য দিয়ে, তাৎপর্য-সন্ধানের দ্বিবাচনিকতাকে প্রমাণিত করেছিলেন তিনি। বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন, সমস্ত উত্তাপের সূত্র প্রচ্ছন্ন রয়েছে মানুষের স্মৃতিসত্তায়। উপন্যাসত্বের প্রকাশ হিসেবে যিনি জীবনকে দেখছেন, তার কাছে তাই সব মুহূর্তই নতুন সূচনার মাহেন্দ্রক্ষণ: শেষ কথা বলে কিছু নেই। প্রতিটি ধারাই মোহনায় পৌছে উৎসে ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে। পুরোপুরি হারিয়ে যায় না কিছুই, প্রতিটি তাৎপর্য গড়ে ওঠে প্রত্যাবর্তনের উৎসব-মুখরতায় যাতে চলমানতা একমাত্র আধেয়।

পাঁচ

স্বনামে কিংবা সহযোগীদের নামে প্রকাশিত রচনাগুলি অভিনিবেশের সঙ্গে যখন পড়ি, সাম্প্রতিক পাঠক-কেন্দ্রিক সাহিত্যতত্ত্বের প্রাসঙ্গিকতাও যেন আরো একটু স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রতিবেদনের তাৎপর্য মূলত গ্রহীতা পাঠকের ভাবাদর্শগত অবস্থানের ওপর অনেকখানি নির্ভর করে। বস্তুত বাখতিন যে দ্বিবাচনিক সত্যকে জীবনের ও সাহিত্যিক পাঠকৃতিতে অধ্যয়ন করতে চান, তা নিরন্তর বিচরণশীল উচ্চারণের সামাজিক প্রাসঙ্গিকতার ওপর অনেকটা নির্ভর করে। বাখতিনের তত্ত্ববিশ্বে প্রতিবেদন খুব গুরুত্বপূর্ণ; পাঠকৃতির নির্মিতি-বিজ্ঞান সম্পর্কে খুব প্রয়োজনীয় বিশ্লেষণী পাঠ আমরা বাখতিনের কাছে পেয়েছি। যিনি বলেছেন, অস্তিত্ব আসলে সংগঠন, তাঁর কাছে প্রতিবেদনও মূলত দুটি সামাজিক সত্তার মধ্যবর্তী সেতু। অপরতার সঙ্গে সত্তার নিরন্তর জায়মান দ্বিবাচনিক সম্পর্ক অর্থাৎ ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত হয় ভাষায়, চেতনায়। বাখতিনের বিখ্যাত সূত্র—চেতনা মানে অপরতার বোধ—এখানে উল্লেখ করতে পারি। এই বোধ যখন ভাষায় প্রতিফলিত হয়, সৃষ্টি হয় নতুন তাৎপর্য। মানবচৈতন্যের বহুরৈখিক ও সৃজনশীল সীমান্ত অঞ্চলে ভাষা নির্মিত ও পুননির্মিত হয়। উচ্চারণ সোচ্চার হোক বা নিরুচ্চার, গ্রহীতা সক্রিয় হোক বা নিষ্ক্রিয়—ভাষার প্রায়োগিক বলয় গড়ে ওঠে ঐ অপর সত্তার প্রকাশ্য বা প্রচ্ছন্ন উপস্থিতিতে। অস্তিত্বের মতো ভাষাও তাই নিশ্চিত সংগঠন ছাড়া ব্যক্ত হতে পারে না। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, বাখতিনের বইগুলিতে কয়েকটি অন্যোন্য-সম্পৃক্ত মৌলিক ধারণা বারবার ব্যবহৃত হয়েছে, যেমন: সত্তা ও অপর, ঘটনা ও মুক্ত উপসংহার সম্পন্ন ধারাবাহিকতা, চেতনার প্রান্তরেখা ও বহিরঙ্গতা, পারস্পরিক প্রতিক্রিয়াময় সৃজন-পদ্ধতি ও সামাজিক মূল্যায়ন, একবাচনিকতা ও দ্বিবাচনিকতা ইত্যাদি। বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে বাখতিনের চিন্তায় এইসব ধারণা পরস্পরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে মিশে থাকে। এইজন্যে পাঠকের দায়ও বেড়ে যায় অনেকটা কেননা তাঁকে সর্বদা বাখতিনের সামগ্রিক আকল্প সম্পর্কেও অবহিত থাকতে হয়। মনে রাখতে হয় যে বাখতিন প্রচলিত অর্থে কোনো ভাব-প্রস্থানের প্রবক্তা নন। এমনকি তাঁকে অভ্যস্ত আকরণেও বন্দি করা যায় না। অথচ মানবিক

৩৫