পাতা:বাখতিন - তপোধীর ভট্টাচার্য.pdf/৪০

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

নির্মিতির বিশ্লেষণে তিনি আমাদের সত্যকে শনাক্ত করার মতো যথেষ্ট উপযোগী কৃৎকৌশল উপহার দিয়েছেন।

 মননশীলতার সূচনা থেকে পরিণতিতে পৌঁছানো পর্যন্ত নিজের নির্দিষ্ট কয়েকটি কেন্দ্রীয় বিশ্বাসকে বাখতিন বারবার পরখ করেছেন, যুক্ত করেছেন নতুন নতুন বিভঙ্গ। তাই Art and Answerability বইতে নান্দনিক প্রক্রিয়ায় লেখক ও নায়ক সত্তার গুরুত্ব সম্পর্কিত (১৯৯০: ২২) নিবন্ধে তিনি লিখেছেন, কোনো নান্দনিক প্রক্রিয়া তখনই সাকার হয়ে ওঠে যখন তাতে অন্তত দু’জন ব্যক্তি তাদের সমান্তরাল চেতনা নিয়ে উপস্থিত থাকে। তাঁর মতে, কোনো নিঃসঙ্গ চেতনায় কখনো সত্তার উপলব্ধি হতে পারে না; ব্যক্তি যখন নিজের বাইরে অপর চেতনার অস্তিত্ব সম্পর্কে অবহিত হয়ে ওঠে, তখনই তার মধ্যে তৈরি হয় সত্তার সাংগঠনিক তাৎপর্য সম্পর্কে উপলব্ধি। ঐ বইতে বাখতিন আরো লিখেছেন, আমরা যখন কাউকে দেখি বা জানি, সেই দেখা বা জানা নির্দিষ্ট একটা অবস্থান থেকেই হয়ে থাকে। তার মানে, আমরা যা দেখতে পাই, তা আবার ঐ মনোযোগের কেন্দ্রস্থিত মানুষটি তার নিজের সম্পর্কে দেখতে বা জানতে পারে। না। আমরা যখন পরস্পরের দিকে তাকাই, আমাদের চোখের তারায় দুটি ভিন্ন জগৎ প্রতিফলিত হয়ে থাকে। এই ভিন্নতাকে যদি পুরোপুরি মুছে ফেলতে হয়, পরস্পরের মধ্যে এক ও অভিন্ন ব্যক্তি হিসেবে মিশে যেতে হবে। প্রত্যেকেই নিজের অবস্থানে অনন্য ও অপরিবর্তনীয় আবার এই মৌলিক উপলব্ধির জন্যেও চাই অপর সত্তার উপস্থিতি। অন্তর্জীবনকে যদি প্রাণবান করে তুলতে চাই, যেতে হবে বহির্বৃত ভিন্ন জগতে অর্থাৎ এক চেতনার স্তরে। রবীন্দ্রনাথের ভাষা ব্যবহার করে বলা যায়, এ যেন চোখের আলোয় চোখের বাহিরকে দেখা এবং বাইরে যখন নিরালোক, সে-সময় অন্তরের গভীরে দৃষ্টিপাত করা। এই বিন্দুতে শুরু হয়ে যায় পাঠকের নিজস্ব পরিসর-সন্ধান এবং সেই সঙ্গে, প্রতিবেদনে অন্য এক পর্যায়ে, প্রমাণিত হয় বিষয়বস্তুর আকরণ থেকে লেখকেরও কৃৎকৌশলে পৌঁছানোর অনিবার্যতা

 বাখতিনের চিন্তা অনুসরণ করে আমরা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাই। তা হলো, সাহিত্যে কিংবা জীবনে কারো আত্মগত অভিজ্ঞতা কখনো সম্পূর্ণ, চূড়ান্ত ও সার্বিক তৃপ্তি-সম্পন্ন হয় না; সত্তার কোনো উপস্থাপনাই সত্যের সমগ্রতাকে তুলে ধরতে পারে না। বাখতিনের অননুকরণীয় ভাষায় ‘I always have a loophole' (তদেব: ৪০) কেননা ‘আমার’ তাৎপর্য সর্বদা পূর্ণতার প্রতীক্ষা করছে। এবিষয়ে আরো বিস্তারিত বয়ান পাই ডস্টয়েভস্কির নন্দন সম্পর্কিত আলোচনায় (১৯৮৪: ২৩২-২৩৬)। তাৎপর্যের চূড়ান্ত প্রতীতি যখন কোনো লেখকের অন্বিষ্ট, তিনি তখন তাঁর রচনায় সানুপুঙ্খ গ্রন্থনার মধ্য দিয়ে এক নায়কের পরিপূর্ণ উপস্থিতিকে তুলে ধরেন। এই উপস্থাপনায় আবিষ্কারযোগ্য কোনো রহস্য থাকে না কোথাও; সমস্ত তাৎপর্য তাই পাঠকৃতিতে নিঃশেষিত হয়ে যায়। নায়কের সব দিক জানার আগ্রহে তাকে লেখক এমনভাবে নিঙড়ে নেন যে পাঠকের কিছুই করার থাকে না আর। ফলে ঐ চরিত্রটি কার্যত মৃত হয়ে পড়ে। বাখতিন এই প্রসঙ্গে ভেবেছেন, মৃত্যুকে তাহলে বলা যেতে পারে ‘the form of aesthetic consumation of an individual’ (১৯৯০: ১৩১)। চিন্তাকে পরবর্তী পর্যায়ে আরো অনেকটা। এই প্রসারিত হতে দেখি। কোনো ধরনের চূড়ান্ত বিন্দুতে বাখতিনের অবিশ্বাস যখন গাঢ়তর

৩৬