পাতা:বাখতিন - তপোধীর ভট্টাচার্য.pdf/৪২

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

ব্যতিক্রম নয়। যেহেতু সৃষ্টিপ্রক্রিয়া মূলত অস্তিত্বের সংগঠন, এক মুহূর্তের জন্যেও ঐ প্রক্রিয়ায় জীবন্ত সামাজিক সংযোগ শিথিল হয় না। প্রতিটি মুহূর্ত মুখর থাকে উপস্থিত ও অনুপস্থিত সমাজসংবিদের সোচ্চার ও নিরুচ্চার গুঞ্জনে। প্রতিটি ভাবাদর্শবাহিত প্রকরণের মতো বাচনিক শিল্পও “intrinsically, immanently sociological' (১৯৮৭: ৯৫)। প্রথম পর্যায়ের রচনা থেকে ‘Freudianism' শীর্ষক বইতে অন্তর্ভুক্ত ঐ রচনায় পৌঁছাতে-পৌঁছাতে বাখতিনের বক্তব্যে লক্ষণীয় পরিবর্তন হয়ে গেছে। তাৎপর্য এবার আর অপর (লেখক) দ্বারা নির্মিত নয় যাকে নিস্ক্রিয় গ্রহীতা সত্তার (নায়ক) কাছে দান হিসেবে তুলে দেওয়া যায়। এই পর্যায়ে তাৎপর্য মূলত সামাজিক উপলব্ধি যাকে সৃষ্টিশীল সংগঠনে যোগদানকারীদের সম্পূর্ণ সামাজিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ফসল বলা যেতে পারে। স্বভাবত এখানে সামাজিক প্রতাপ ও তার বহুস্তরান্বিত কৃৎকৌশল বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। সামাজিক অবস্থান অনুযায়ী নির্ধারিত হয় সত্য এবং তার প্রাকরণিক কাঠামো। অতএব বাখতিনের তত্ত্ববিশ্বে দ্বিবাচনিক আন্তঃসম্পর্ক বিমূর্তায়িত ধারণা নয় কোনো, বস্তুগত ইতিহাস ও সামাজিক আকরণে নিহিত প্রতাপের যুক্তিশৃঙ্খলা তার চরিত্র ও অভিব্যক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে।

 ১৯২৮ সালে প্রকাশিত এবং মেডভেডেভ-স্বাক্ষরিত The Formal Method in Literary Scholarship বইতে প্রকরণবাদী নন্দনের সমালোচনা এবং মার্ক্সীয় সমাজতাত্ত্বিক নন্দনের প্রস্তাবনা করা হয়েছে। এতে প্রকরণবাদের সঙ্গে সঙ্গে কিছু কিছু মার্ক্সবাদী তাত্তিকের একপেশে ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে বিষয়বস্তু ও প্রকরণের অবিভাজ্যতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সামগ্রিক ভাবাদর্শগত অণুবিশ্বের অপরিহার্য অঙ্গ হিসেবে সাহিত্য কীভাবে অন্যান্য প্রকাশ-মাধ্যমের বিচ্ছুরণকে আত্মস্থ করে নেয় এবং আর্থসামাজিক বাস্তবতার স্বরূপকে উন্মোচিত করে—এটা দেখাতে চেয়েছেন বাখতিন/ মেডভেডেভ। রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বিকাশের সঙ্গে বাক্‌শিল্পের জটিল সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বাখতিন জীবনের শেষপর্বে ‘মহাসময়’ ও ‘অণুসময়’ -এর যে দ্বিবাচনিক দর্শন উত্থাপন করেছিলেন (১৯৮৬: ৪), তার প্রাথমিক সূত্রপাত হয়েছিল এখানে। ভোলোশিনোভ স্বাক্ষরিত Marxism and the Philosophy of Language (১৯২৯) বইতে ভাষাতত্ত্বের আকরণবাদী (সোস্যুরীয়) ব্যাখ্যা সমালোচিত হয়েছে। ব্যক্তিকেন্দ্রিক আত্মতাবাদ ও বিমূর্ত বস্তুবাদকে ভাষাবিশ্লেষণের ক্ষেত্রে দু’ধরনের বাধা হিসেবে দেখিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, ব্যক্তির সৃষ্টিপ্রতিভা বা ভাষাগত আকরণে বিপুল ঐতিহাসিক পরিবর্তনের প্রক্রিয়া কতটা গুরুত্বপূর্ণ—আকরণবাদ তা বিশ্লেষণে অক্ষম। বরং ব্যক্তিসত্তা ও সামাজিক সত্তার মধ্যে অযৌক্তিক বৈরিতা কল্পনা করে ভাষাচেতনায় নিহিত সত্যকে তা উন্মূল করে দেয়। ভাষা মূলত ভাবাদর্শের চিহ্নায়ন প্রক্রিয়া; প্রতিটি বাচনিক একক আসলে একেকটি চিহ্নায়ক। কিন্তু এদের বিমূর্ত ভাবে, প্রসঙ্গ-বিচ্ছিন্ন করে, বোঝা যায় না; বুঝতে হয় পারস্পরিক সম্পর্কের অন্বয় বা অনম্বয়ে। এইজন্যে ভাষা আলোচনায়ও বাখতিনের কাছে গুরুত্ব পেয়েছে ঘটনা ও ধারাবাহিকতা, উদ্ভব-প্রক্রিয়া ও মূল্যায়ন, সীমারেখা ইত্যাদির পারিভাবিক প্রয়োগ। তবে তখনই প্রথম একবাচনিকতার বিপ্রতীপে উত্থাপিত হলো দ্বিবাচনিকতার ধারণা। আকরণবাদীদের মতো ভাষাকে বিচ্ছিন্ন, স্বয়ংসম্পূর্ণ, বাচনিক ও প্রকৃত প্রসঙ্গ থেকে বিচ্যুত, একান্তিক উচ্চারণ হিসেবে ভাবেননি

৩৮