পাতা:বাখতিন - তপোধীর ভট্টাচার্য.pdf/৫২

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

(তদেব)। যেন বা নীড়ে ফেরার উৎসবের মধ্য দিয়ে প্রতিটি তাৎপর্য ফিরে আসে উৎসে, এই উপলব্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তা ভাষার অন্তর্বৃত দ্বিবাচনিকতাকে অনন্ত করে তোলে। যে-সমস্ত বাচনিক উপকরণ ব্যক্তিগত ও সামূহিক অভিজ্ঞানকে সংগঠিত করে তাদের বুঝে নিতে হয় রূপান্তরশীল সময়ের সঙ্গে অনস্বীকার্য দ্বিরালাপে। সময়-স্বভাবকে যদি স্বীকার না করি, পরিবর্তন অপ্রতিষ্ঠ হয়ে যাবে; যেখানে পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই, সেখানে পার্থক্যপ্রতীতিও নেই। আবার পার্থক্য-প্রতীতির অভাবে তাৎপর্য থাকতে পারে না কোথাও। যদি তাৎপর্য না থাকে, জগতের অস্তিত্ব অসম্ভব।

 এভাবে দৈনন্দিন জীবনের অজস্র দ্বিবাচনিকতা ব্যাপকতর ও গভীরতর চিহ্নায়ন প্রকরণের প্রেক্ষিতে সম্পৃক্ত। তাৎপর্যপূর্ণ সম্বোধ্যমানতার অতীত সক্রিয়তার স্মৃতিতে গড়ে ওঠে পরবর্তী সব চিহ্নায়ন প্রকরণ। এইজন্যে বলা হয়, দ্বিবাচনিকতার প্রেক্ষিত অন্তহীন। মহাসময় ও মহাপরিসরের মধ্যে অন্তর্বৃত খণ্ডকাল ও খণ্ডপরিসর দ্বিরালাপের মধ্য দিয়েই প্রতিদিনকার অভিজ্ঞতায় ফিরিয়ে আনে স্বর ও অন্তঃস্বরের সমারোহ। তাই অতীতকে রুদ্ধ বলা যায় না, কারণ তা শেষ হয়ে যায়নি; বর্তমানও একইভাবে সমাপ্তিহীন। পূর্বসূরিদের জগৎ সাম্প্রতিক প্রজন্মের জগতে অনবরত পুনর্জন্ম লাভ করছে। এই সমান্তরালতা উচ্চারণকে দ্বিস্বরিক করে তোলে। একদিকে বর্তমান অতীতকে সম্বোধন করে, অন্যদিকে অতীতের দ্বারা সম্বোধিত হয়। বর্তমানের মধ্যে অতীতের অনুপস্থিত উপস্থিতি অনুভবগম্য; অতীত চিহ্নায়কদের উপস্থিতিকে কার্যত কখনো চূড়ান্ত করা যায় না। এইজন্যে বাখতিন বলেন: ‘Every word is directed toward an answer and cannot escape the profound influence of the answering word that anticipates.’ (১৯৮১: ২৮০)। এই মন্তব্যটির গুরুত্ব অসামান্য, কেননা এর তাৎপর্য সৃদূরপ্রসারী। তাই এই মন্তব্য নিবিড় পাঠ দাবি করে।

 প্রতিটি শব্দই ছুটে চলেছে সম্ভাব্য প্রত্যুত্তরের দিকে: এর মানে হলো, বাচনমাত্রেই মীমাংসা-গর্ভ। সার্থক উচ্চারণ জন্মসূত্রেই সম্বোধ্যমানতার দ্যোতনা বয়ে আনে। অর্থাৎ সম্ভাব্য গ্রাহকদের সমাজে উদ্ভূত ও পুষ্ট হয়ে মানবকেন্দ্রিক মূল্যায়নের প্রেক্ষিতে কোনো উচ্চারণ অন্বিষ্টের প্রতি আভিমুখ্য অর্জন করে। সম্বোধক হিসেবে আমরা স্বতশ্চলভাবে আমাদের সম্ভাব্য গ্রাহক-শ্রোতা-সম্বোধিতদের অবস্থানও রচনা করে চলি। আমাদের কথা তাই মূলত বয়ন এবং এই বয়ন রচনার মধ্য দিয়েই আমরা নিজেদের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ পুনর্গঠনের সক্রিয়তাও অর্জন করে নিই। এমন পুনর্গঠন ঘটে মানব-অস্তিত্বের নিজস্ব সময়ে ও পরিসরে। এইজন্যে বলা হয়েছে ‘We anthropomorphize values.’ (ক্লার্ক ও হলকুইস্ট: ১৯৮৪: ২০৫)।

 মানব সমাজ মানেই মূল্যবোধের পুষ্পায়নের অংশীদারদের সংলগ্নতা। যাকে বাচনের প্রেক্ষিত বলি, তা ঐ সামাজিকতার সূত্রে বিধৃত। এতে রৈখিকতার অবকাশ নেই কারণ দৃশ্য ও অদৃশ্য আয়তনের সংঘর্ষ থেকেই জাগে উচ্চারণ। তাতে সত্তা ও অপরতার সম্পর্কে প্রচ্ছন্ন সোচ্চার ও নিরুচ্চারের অন্তর্বয়ন ধরা পড়ে। এই অন্তর্বয়ন স্বর ও প্রতিস্বরের সমারোহে সৃষ্ট হয়; অস্তিত্বের বিভিন্ন আয়তনের সমান্তরাল উপস্থিতির মধ্যে পুননির্মিত হয় জীবনের অভিজ্ঞান। তাই কোনো উচ্চারণ-ই বিচ্ছিন্ন এককমাত্র নয়। সত্তার গভীরে একক বাচন ও

৪৮