পাতা:বাখতিন - তপোধীর ভট্টাচার্য.pdf/৫৬

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

কেননা সংঘর্ষ কখনও নিছক ব্যক্তিগত আততির অভিব্যক্তি নয়, তার পেছনে সক্রিয় থাকে। প্রচ্ছন্ন বা প্রকাশ্য সামাজিক অভিজ্ঞতার টানাপোড়েন। বাখতিন/ভেলোশিনোভ লিখেছেন: ‘each word...is a little arena for the clash of and criss-crossing differently oriented social accents. A word in the mouth of particular individual is a product of the living interaction of social forces.’ (১৯৭৩: ৪১)।

পাঁচ

বিভিন্ন সামাজিক স্বরের মিথস্ক্রিয়া কিংবা ঘাত-প্রতিঘাত প্রতিটি উচ্চারণের অপরিহার্য আবহ। কোনো বিশেষ মুহূর্তে কোনো একজন ব্যক্তি শুধুমাত্র নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও একক উপলব্ধি নিঙ্‌ড়ে নিয়ে কথা বলেন না। অজস্র সামাজিক শক্তির জীবন্ত মিথষ্ক্রিয়ার বাচনিক ফসল হিসেবে উদ্ভূত হয় ব্যক্তির উচ্চারণ। প্রতিটি উচ্চারণের পশ্চাৎপট তাই বিপুল ও বিস্তৃত; সেই পরিসরে প্রত্যেকের একক বাচন সমান্তরাল অপরসত্তাদের বাচনের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন ও নিবিড় সংঘর্ষে লিপ্ত। তাই যিনি সম্বোধক, তাঁকে বাধ্যতামূলক ভাবে সম্বোধ্যমানতার প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতেই হয়। তিনি সর্বতোভাবে সামাজিক উচ্চারণের সূত্রধার; কোনো-একটি মুহূর্তের বিচ্ছিন্ন উচ্চারণে তাঁর একান্ত ব্যক্তিগত ইচ্ছা বা প্রবণতার প্রকাশ ঘটে না শুধু। তিনি জটিল ও গতিময় সামাজিক প্রকরণেরও অংশীদার। তবে এমন ভাবার কারণ নেই যে, এতে তাঁর বাচনের মুক্ত ও স্বাধীন সঞ্চরণে কোনো বিঘ্ন ঘটছে। আসলে বাচনের অন্তর্বৃত সাংস্কৃতিক রাজনীতির অংশীদার হিসেবে সম্বোধককে শুধু মনে রাখতে হচ্ছে, ভাষা একই সঙ্গে তাঁর যুদ্ধের আয়ুধ ও যুদ্ধক্ষেত্র। যে-প্রতিবেদন তার ঈপ্সিত, সেখানেও একই সত্যের বিচ্ছুরণ ঘটছে। তাঁকে সম্বোধিতের অস্তিত্ব ও সম্বোধ্যমানতার প্রক্রিয়া সম্পর্কে প্রতিটি মুহূর্তে অবহিত থাকতে হচ্ছে; বুঝে নিতে হচ্ছে মুক্তি ও স্বাধীনতা শুধু তার একার প্রাপ্য নয়।

 কোন সামাজিক পরিস্থিতি তাঁর অস্তিত্বের নিয়ামক এবং কোন বৃহত্তর ঐতিহাসিক অবস্থান ভেতরে ও বাইরে অস্তিত্বের উপরে ছায়াতপ ছড়িয়ে দিচ্ছে, তা খুবই জরুরি বিষয়। আর, না লিখলেও চলে, এতেই নিঃশ্বাস নিচ্ছে সামূহিক বাচন। একক বাচনের সূক্ষ্মতা ও স্বাতন্ত্র্য ঐ একই প্রেক্ষিতের দ্বিবাচনিক স্বভাব থেকে উৎসারিত হচ্ছে। সাধারণ বিচারে ভাষার বিধি-বিন্যাসে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ থাকলেও জায়মান উচ্চারণের নিরিখে তা নিয়ত-নির্মীয়মান বর্তমানের স্পন্দিত অভিব্যক্তি। এতেই আভাসিত হয় ভবিষ্যৎ এবং পুনরুত্থাপিত হয় অতীতের স্মৃতিসত্তা। বর্তমান বলতে এখানে সময়ের সঙ্গে পরিসরকেও বোঝাতে চাইছি। সময় এবং পরিসরের অজস্র আকল্প থেকে চিহ্নায়ন প্রকরণের নতুন নতুন অনুপঙ্খ ও কৃৎকৌশল আহরণ করে নেয় ভাষা। এখানেই তার বদ্ধতা থেকে মুক্তির দিকে প্রবহমান থাকার শক্তির উৎস।

 ফলে সার্থক বাচনে কখনও নিছক বিবরণ থাকে না, থাকে বিবরণ পেরিয়ে যাওয়ার আর্তি। উদ্বুদ্ধ ও উদ্দীপিত করার আকাঙ্ক্ষা যখন সঞ্চারিত হয় বাচনের কোষে-কোষে, আমরা বলি, উচ্চারণের জন্ম হলো। এ এক নতুন জগৎ যাতে বস্তুবিশ্ব চিহ্নবিশ্বে রূপান্তরিত হয়ে যায়। এই রূপান্তরে নন্দনের প্রেরণা আসলে ভাবাদর্শের প্রবর্তনা, যেহেতু চিন্তাবীজ পুষ্পিত না-হলে বস্তু কখনও চিহ্নায়কের মর্যাদা অর্জন করে না। বাখতিনের প্রাসঙ্গিক মন্তব্য

৫২