পাতা:বাখতিন - তপোধীর ভট্টাচার্য.pdf/৫৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

স্মরণ করা যায়: ‘Everything ideological has semiotic value...The domain of ideology coincides with the domain of signs.’ (তদেব: ১০)। ঘাস থেকে নক্ষত্র, ধুলো থেকে ছায়াপথ—সব কিছুই চিন্তার আকর; তাই অণীয়ান থেকে মহীয়ান চিহ্নায়কে পরিণত হতে পারে। এই রূপান্তরের মধ্য দিয়ে নির্ণীত হয় এদের মূল্য। আমাদের বাচনে এদের পারস্পরিক স্বাতন্ত্র্য যখন প্রতিফলিত হয়—সময় ও পরিসরের নির্যাস থাকে স্বাতন্ত্র্যবোধে। তা যুগপৎ ব্যক্তিগত ও নৈর্ব্যক্তিক, সত্তাতাত্ত্বিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক। চিহ্নের পর চিহ্ন জমে ওঠে; চিন্তার সঙ্গে বস্তুবিশ্বের সেতু রচনার নতুন নতুন আকল্প দেখা দেয়।

 সব শেষে যা থাকে, তা হলো উচ্চারণ; অনুভূতি থেকে ভাবাদর্শ অর্থাৎ সত্তা থেকে জগৎ পর্যন্ত তার বিস্তার, তারপর পুস্পায়ন। অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি আমাদের অন্তর্জগৎ ও বহির্জগৎকে একই তালে-লয় গাঁথে। তাই বাচন মানে গ্রন্থনা—এপার আর ওপারের সেতু। মনশ্চর্যা ও ভাবাদর্শের মধ্যে কোনো সীমান্ত নেই, থাকতে পারে না। উচ্চারণের সত্তাতত্ত্ব ও জ্ঞানতত্ত্ব তাই বাহির ও ভেতরের মধ্যে নিরন্তর যাতায়াতের নিদর্শন। অন্তর্বৃত চিহ্নায়কেরা যেন ডুবুরির মতো; এরা যখন বহিবৃত হতে থাকে, নানাভাবে তাদের অভিব্যক্তি তৈরি হয়। বাস্তব ও রূপকের মধ্যে চিরাগত দেয়ালগুলি ভেঙে পড়ে না কেবল, পরস্পরের সঙ্গে মিশে গিয়ে নব্য সমগ্রতার দ্যোতনা গড়ে তোলে। এই যে পুনর্নবায়ন বা পুনর্গঠন—তাতেই উচ্চারণের নতুন নতুন তাৎপর্যের সম্ভাবনা দেখা দিতে থাকে।

 বাখতিনের ভাষা-ভাবনা ও উচ্চারণতত্ত্ব তাই সাহিত্যিক পাঠকৃতির অনুষঙ্গে বিচার্য নয় কেবল; জীবনের নবায়মান বয়ানের নিরিখে তা অনুশীলনযোগ্য। বাচন রয়েছে মুক্ত অস্তিত্বের কেন্দ্রে; তার প্রতীতি মানে মুক্তি ও স্বাধীনতার উপলব্ধি। এমন উপলব্ধি যাকে সম্বোধ্যমানতার অর্থাৎ দ্বিবাচনিক প্রেক্ষিতের বাইরে অর্জন করা যায় না কখনও। সক্রিয়তার বহুরৈখিক প্রকরণে, নিরবচ্ছিন্ন প্রত্যুত্তর প্রত্যাশার আবহে, আত্ম-অভিজ্ঞান ও জগৎ-সন্ধানের যুগলবন্দিতে চিনি ঐ প্রেক্ষিতকে। জানি, প্রতিটি উচ্চারণ আরও সম্ভাব্য উচ্চারণমালার অনুষঙ্গে তাৎপর্যবহ হয়ে উঠছে। তাৎপর্যকে নতুন করে পাব বলে ক্ষণে-ক্ষণে তাকে হারিয়ে ফেলছি। স্বাধীন মুক্ত সক্রিয়তায় নিজেকে গড়ছি, নিজেকে ভাঙছি। বাখতিন-ভাবনায় মীমাংসার অর্জন নয়, প্রত্যাশাই বড়ো। আর, সূক্ষ্মভাবে এই প্রত্যাশায় প্রচ্ছন্ন রয়েছে। যোগ্যতার অনুভব। সার্থক উচ্চারণের মধ্যে ঐ যোগ্যতাকে নির্মাণ করি আমরা, কী সৃষ্টিতে কী মননে। যোগ্য হয়ে ওঠার অনুভবই সত্তার নান্দনিক জিজ্ঞাসায় ব্যক্ত হতে থাকে; উচ্চারণ তাই চিরদীপ্যমান, চিরনবীন।

৫৩