পাতা:বাখতিন - তপোধীর ভট্টাচার্য.pdf/৫৮

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।


সম্ভাব্য জবাবের নির্মিতি

সওয়াল-জবাব। এই শব্দবন্ধকে বিতর্কসভা আর বিচারালয়ের অনুষঙ্গ ছাড়া ভাবতেই পারি না। যদিও ভারতীয় দর্শনের উপস্থাপনা-পদ্ধতিতে পূর্বপক্ষ-উত্তরপক্ষ নামক বিন্যাস-প্রতিন্যাস খুব গুরুত্বপূর্ণ। পূর্বপক্ষের প্রত্যুত্তর হিসেবে সুপরিকল্পিত ও প্রণালীবদ্ধ ভাবে নির্মিত হয় উত্তরপক্ষ। অতএব নিশ্ছিদ্র যুক্তি ও পিনদ্ধ বিশ্বাস তার মুখ্য অবলম্বন। কিন্তু এইসঙ্গে এটাও মনে রাখতে হয় যে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষের যৌক্তিক উপস্থাপনা হিসেবে পরিকল্পিত পূর্বপক্ষও মূলত মীমাংসা-প্রয়াসীর নির্মিতি। ফলে পূর্বপক্ষের বাচনে পদে-পদে প্রচ্ছন্ন থাকে প্রতিবাচন যা নিরাকৃত হওয়ার জন্যেই উত্থাপিত। কারণ, মীমাংসা-প্রয়াসী নিগূঢ় মনস্তাত্ত্বিক কারণে প্রতিপক্ষের হাতে কখনও তেমন অস্ত্র তুলে দেবে না যাকে প্রতিহত করা অসম্ভব। তার মানে, যাকে ভাবছি পূর্বপক্ষের সওয়াল, তার প্রত্যাখ্যান পূর্ব-নির্ধারিত। দার্শনিক প্রতিবেদন নির্মাণ ও বিনির্মাণের এই পরম্পরায় গঠিত হয়ে থাকে। সাহিত্যিক প্রতিবেদনে বিন্যাস-প্রতিন্যাসের এই ধরন হয়তো প্রকাশ্য নয়। কিন্তু প্রচ্ছন্নভাবে, ইশারায়, ব্যক্ত ও অব্যক্তের ধূসর সীমান্তে প্রশ্নমালার বিস্তার ও সম্ভাব্য মীমাংসার প্রতি আগ্রহ ফুটে ওঠে। আসলে আমাদের জীবন নামক পাঠকৃতিও তাই। পর্যায়ে পর্যায়ে কখনও সোচ্চার আর কখনও নিরুচ্চারভাবে জেগে থাকে জিজ্ঞাসার উত্থাপন আর সম্ভাব্য প্রত্যুত্তরের উন্মোচন।

 মিখায়েল বাখতিন নেভেল শহর থেকে প্রকাশিত ‘The Day of Art’ নামক একটি পত্রিকার সেপ্টেম্বর, ১৯১৯ সংখ্যায় ‘Art and Answerability’ নামে ছোট্ট প্রবন্ধ লিখেছিলেন। চিন্তা-জীবনের প্রারম্ভিক পর্যায়ে রচিত হলেও নানা কারণে এই প্রবন্ধটি বাখতিন-চিন্তাবিশ্বে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ১৯১৮ থেকে ১৯২৪-এর মধ্যে বাখতিনের চিন্তাজগৎ যখন সংগঠিত হচ্ছিল, বাচন-মূলক সৃষ্টি-প্রকরণ সম্পর্কে নান্দনিক ও দার্শনিক ভাববীজ নানাভাবে অঙ্কুরিত হচ্ছিল। বাচনিক সৃষ্টির অন্তর্বস্তু, উপাদান ও প্রকরণ সম্পর্কিত সমস্যা নিয়ে ভাবছিলেন বাখতিন। ঐসময়কার রচনায় তার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। ডস্টয়েভস্কির নন্দন সম্পর্কিত তাঁর বিখ্যাত বইয়ের প্রস্তুতিও চলছিল তখন। নৈতিক দর্শন, বিষয়ীসত্তা, আইন, নন্দনভাবনা: নানা দিকে তাঁর অভিনিবেশ ছিল। ঐ সময়কার যেসব খসড়া উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, তাদের মধ্যে কোনো তারিখ বা শিরোনাম পাওয়া যায়নি। বাখতিন বিভিন্ন বিষয়ে নানা সময়ে যা-কিছু ভেবেছেন, সেই সব তাঁর চিন্তার প্রধান আকল্পগুলিকে বুঝতে আমাদের সাহায্য করে। এদের বলা যায়, প্রাক্-সন্দর্ভ স্তরের রচনা।

 বাখতিনের চিন্তাবিশ্ব সম্পর্কে যাঁরা বিশেষভাবে অবহিত, তাঁদের কাছে ‘Art and Answerability’ শীর্ষক রচনাটির আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। কারণ, এটি তাঁর প্রথম প্রকাশিত প্রবন্ধ। এতে ঐক্য-বিষয়ক দুটি ভিন্ন ধারণার বিরোধিতা দিয়ে লেখক তাঁর বয়ান শুরু করেছেন। প্রথম ধরনের ঐক্য হলো যান্ত্রিক; যে-সব অংশ কোনো সমগ্রকে নির্মাণ করে, তাদের পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করে দেয় পুরোপুরি বহির্বৃত উচ্চারণ। এরা

৫৪