পাতা:বাখতিন - তপোধীর ভট্টাচার্য.pdf/৬৮

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

আধুনিকোত্তরবাদী চিন্তা-সন্ত্রাসের পর্যায়েও ঐ সংযোগের মৌল সম্ভাবনা আচ্ছন্ন হতে পারে না। এ কেবল বিশ্বাস নয়, এ হলো আস্তিত্বিক ও সামাজিক তথ্য। এই মৌল তথ্যের বিরুদ্ধে যাওয়া চলে না কেননা হওয়ার বিরুদ্ধে যেতে পারে না কেউ। বলা বাহুল্য, এই হওয়া কাঙ্ক্ষিত নয় শুধু, এ আসল জৈবিক ও ঐতিহাসিক ভাবে অপরিহার্য।


পাঁচ

বাখতিনের প্রত্যুত্তর-যোগ্যতা বিষয়ক ভাবনায় তাই ‘যোগ্যতা’ কথাটি শেষ পর্যন্ত সর্বজনীনতার ইঙ্গিত বয়ে আনে। কেননা মানবিক সত্তার প্রকল্পকে নির্মাণ করতে গেলে এই যোগ্যতা শুধু প্রত্যাশিত ঘোষণামাত্র থাকে না। মানবিক বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন হওয়ার পক্ষে এ হলো ন্যূনতম অভিজ্ঞান। নিরন্তর উত্থাপিত জিজ্ঞাসার জবাব তৈরি করতে হবে মানবিক দায়বদ্ধতার তাগিদে। নইলে নিশ্চরিত্র বা লক্ষ্যশূন্য যথাপ্রাপ্ত জগৎ রূপান্তরিত হয়ে কাঙ্ক্ষিত তাৎপর্যের অভিমুখী হবে না। উদ্যমের মধ্য দিয়ে নিজস্ব জগৎ ও তার মূল্য গড়ে তুলতে হবে। কোনো তাৎপর্যই পূর্বনির্ধারিত নয় বা কোনো জগৎই তাৎপর্যের নিরিখে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। অজস্র অপরতার সঙ্গে গ্রথিত মানুষই প্রকৃত স্রষ্টা এবং অর্জিত তাৎপর্যের ভোক্তা। নির্মিতির দিক দিয়ে কেউ এগিয়ে বা কেউ পিছিয়ে থাকতে পারে; কিন্তু কেউই সম্পূর্ণ মূল্যহীন হয় না। তবে ন্যূনতম প্রাক্‌শর্ত হলো, উদ্যমের নির্মিতিতে নিছক প্রয়োজন নয়—দায়বোধের অভিব্যক্তি ঘটবে।

 মূল্যনিরপেক্ষ জীবন যাপন করা কোনো সচেতন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। কেননা ইতিহাসকে কেউ উপেক্ষা করতে পারে না, অস্বীকার করতে পারে না বিশেষ সময় ও পরিসরের অন্তর্বয়নকে। সওয়াল তৈরি করতে করতে আর জবাব খুঁজতে খুঁজতে পার হয়ে যায় জীবন। কতবার বাহির ও ভেতরের সংজ্ঞা ও অবস্থান পালটে যায়, বিভিন্ন অবস্থানের অভ্যন্তরীন সীমানা রূপান্তরিত হয়। তবুও অব্যাহত থাকে মীমাংসা-যোগ্যতা অর্জন করার প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়াই রচনা করে ব্যক্তি-জীবন ও সামূহিক জীবনের ইতিহাস; উদ্যম ও চিন্তার সন্দর্ভে বারবার পুনঃপঠিত হয় অনন্যতা। মুক্ত ও সমাপ্তিবিহীন জীবনের বহুমাত্রিক সময় ও পরিসরের নির্মিতি-প্রকরণকে অনুধাবন করতে করতে ব্যক্তি-অস্তিত্বের উপকূল-রেখায় পৌঁছে যাওয়া: এই হলো বার্তা। মীমাংসা এক অসমাপ্ত প্রকল্প—এই জেনে সম্ভাব্য প্রত্যুত্তরের জন্যে অনবরত তৈরি হতে থাকা—এরই নাম জীবন।

 যখন মনে রাখি যে গভীরতম এই দার্শনিক উপলব্ধিকে বাখতিন ভাষা ও সাহিত্যে অন্যোন্য-সম্পৃক্ত করে নিয়েছিলেন কিংবা সত্তা ও অপরতার দ্বিরালাপে যুক্ত করেছিলেন সৃষ্টি, রচয়িতা ও কর্তৃত্ববোধের স্বভাব সম্পর্কিত জিজ্ঞাসাকে—সম্বোধ্যমানতার বহুস্বরিক প্রক্রিয়া আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষজ্ঞরা লক্ষ করেছেন, ধর্মতাত্ত্বিক ভাবনা ও ধর্ম-নিরপেক্ষ চিন্তাধারাকে বাখতিন একই ভাবে তাঁর চিন্তাবিশ্বের মুক্ত পরিসরে ব্যবহার করেছেন। তবে এ সম্পর্কে বিতর্কেরও অবকাশ আছে। এ সম্পর্কে আর কিছু কথা না-বলে আমরা বরং দীপায়নোত্তর জগতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উৎকর্ষের প্রেক্ষিতে বাখতিনের রচয়িতা-পাঠকৃতি-প্রত্যুত্তরযোগ্যতা-নির্মিতিবিজ্ঞান সম্পর্কিত প্রকল্পে

৬৪