পাতা:বাখতিন - তপোধীর ভট্টাচার্য.pdf/৬৯

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

নিহিত নতুন ধরনের তাৎপর্য অনুধাবন করার চেষ্টা করব। দৈনন্দিন জীবনের বাচনে নিয়ত যেসব বয়ান রচিত হয়ে চলেছে, তাদের সঙ্গে সাহিত্যিক পাঠকৃতিরও নিষ্কর্ষ-সম্পর্কিত আলোচনা থেকে বুঝে নেব, কেন বাখতিনের দার্শনিক নৃতত্ত্বে মানুষ হওয়ার অভিজ্ঞান হলো তাৎপর্যবহ হয়ে ওঠা। ‘to be human is to mean’—এভাবে বাখতিনের কেন্দ্রীয় আকল্পের অন্তঃসার তুলে ধরে। হলক্যুইস্ট লিখেছেন: ‘Human being is the production of meaning, where meaning is further understood to come about as the articulation of values.’ (১৯৯৫: একচল্লিশ)।

 মানুষ যেমন তাৎপর্য সৃষ্টি করে, তেমনই তাৎপর্যও তাকে রচনা করে চলেছে। ইতিহাসের সঙ্গে অপরিহার্য দ্বিবাচনিকতায় মূল্যমানের অভিব্যক্তিও রূপান্তরপ্রবণ মানুষের সঙ্গে অনবরত বদলে চলেছে। পাল্টে যাচ্ছে সম্পর্ক, সত্তার নান্দনিক ও দার্শনিক বৈধতা, উদ্যমের আকরণ ও নির্যাস। এ আসলে নিরবচ্ছিন্ন ভাবে তীব্রতর হয়ে-ওঠা সংঘর্ষের বয়ান। স্বভাবত এই সংঘর্ষ বদলে দিচ্ছে উচ্চারণের অন্তর্বৃত বিন্যাস এবং অপর সমস্ত উচ্চারণের সঙ্গে তার দ্বিরালাপের বৈশিষ্ট্যও। আগেই লিখেছি, আধিপত্যবাদের কৃৎকৌশল প্রত্যাখ্যানের শক্তিও অর্জিত হচ্ছে ইতিহাসের ধারাবাহিকতা থেকে। ইতিহাসই যোগান দিচ্ছে দৃষ্টির উদ্বৃত্ত, নিরন্তর মিথষ্ক্রিয়ার উত্তাপ। কোনো বিশেষ সময়পর্বে কিংবা পরিসরে পাঠকৃতিতে তথ্য যে রূপান্তরিত হচ্ছে চিহ্নায়কে কিংবা চিহ্নায়কপুঞ্জও বিশেষ পরিস্থিতিতে তথ্যপুঞ্জে রূপান্তরিত হয়ে যাচ্ছে, তারও নির্ণায়ক ইতিহাস। মনে পড়ে, তাৎপর্যকে বলা হয়েছে বিশিষ্ট কোনো জনগোষ্ঠীর সময়বাহিত সম্ভাবনার প্রকাশ (Communal possibility)।

 অন্যভাবে বলা যায়, বহু ব্যক্তিসত্তার সমবায়ী উপস্থিতি কোনো বিশেষ কালে-পরিসরে-জনসন্নিবেশে যখন নির্দিষ্ট কিছু জিজ্ঞাসা-প্রকরণ ও সম্ভাব্য মীমাংসা-প্রয়াসের আকল্প নির্মাণ করে নেয়—বিশেষ ধরনের তাৎপর্যসন্ধান ব্যক্ত হয় দার্শনিক ও নান্দনিক উদ্যমে। এমন ঘটে দ্বিবাচনিক সংযোগ নির্মাণের মধ্য দিয়ে। কোনো কারণেই এই মৌলিক বিধি এড়ানো যায় না। বাখতিন বলেন: ‘to be means to communicate dialogically. When the dialogue ends, everything ends.’ (১৯৮৪: ৮৬)। যেহেতু এই সংযোগ শুধু তথ্যের নয়, চিহ্নেরও অর্থাৎ বাচনের সঙ্গে পরাবাচনের—ইতিহাস-নির্দিষ্ট বস্তুবিশ্ব এবং নির্যাস-কেন্দ্রিক চিহ্নবিশ্ব যুপগৎ বিচার্য। মানুষের ইতিহাসের পক্ষে যাঁরা দাঁড়াতে চান, প্রতিবেদনকে ‘communal engagement’ বলে জেনে বাচনকে ‘দ্বিমুখী কৃত্য’ হিসেবে ব্যবহার করা তাঁদের শিখে নিতে হয়। কৃত্যের এই উভচারিতা সম্পর্কে যিনি অবহিত, তাঁর কাছে প্রত্যুত্তরযোগ্যতা অর্জন করার প্রক্রিয়া ও লক্ষ্য সর্বদা দ্বিবাচনিক। বাচনের উৎসে কারা রয়েছে এবং কাদের উদ্দেশে বাচন উৎসারিত হচ্ছে—এই দুটি পক্ষ সমানভাবে কৃত্যের স্বভাব নিয়ন্ত্রণ করছে। অর্থাৎ নির্মাতা এবং নির্মাণের লক্ষ্য: দুটোই প্রতিবেদনের নিয়ামক। তাই আস্তিত্বিক সংগঠনের সঙ্গে উচ্চারণ-বিন্যাসের দায়বোধ তাঁরাই স্বীকার করে নিতে পারেন, যাঁরা নিজেদের সঙ্গে বহির্বৃত জগতে ব্যাপ্ত অপর পরিসরগুলির অনন্যতাও সমানভাবে স্বীকার করেন।

 কৃত্য বা উদ্যম (deed) বাখতিনের কাছে বাচন ও ক্রিয়া—দুই অর্থই দ্যোতিত করে। কীভাবে তাৎপর্য উপলব্ধ হতে পারে এবং বাচন হয়ে উঠতে পারে শরীরী বাস্তব—এই

৬৫