পাতা:বাখতিন - তপোধীর ভট্টাচার্য.pdf/৭৬

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

এই অতি গুরুত্বপূর্ণ এগারো বা বারো বছর বাখতিনকে স্বপ্ন থেকে স্বপ্নভঙ্গের দিকে নিয়ে গিয়েছিল হয়তো; কিন্তু অন্য অনেক চিন্তাবিদের মতো তিনি পলায়নবাদ বা আত্মরতিতে আশ্রয় খোঁজেননি। পার্থক্য ও সমান্তরালতার বোধ কীভাবে দ্বিবাচনিক আন্তঃসম্পর্ককে প্রতিষ্ঠা দেয়, তিনি নিবিষ্টভাবে লক্ষ করেছিলেন। একদিকে কঠোর দারিদ্র্য ও স্বাস্থ্যহানি এবং অন্যদিকে সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতাপের নতুন বিন্যাস জনিত সম্ভাব্য অস্বস্তি বাখতিনকে নিশ্চয় পীড়ন করছিল। কিন্তু পাশাপাশি আভাঁগার্দ চিত্রকলার উত্থান, প্রশ্নমুখর বুদ্ধিবাদ, দার্শনিক অন্বীক্ষা, নন্দনতাত্ত্বিক জিজ্ঞাসার উত্তাপ বাখতিনকে দিচ্ছিল নতুন-নতুন চিহ্নায়কের সন্ধান। বলা যায়, এই পর্বে যেন ভিত্তি তৈরি হলো পরবর্তী অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধতর আরেকটি মৌলিক উপলব্ধির: প্রতিটি তাৎপর্য সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জনীয়। বলা বাহুল্য, মার্ক্সবাদী বীক্ষায় সংগ্রাম হলো মানববিশ্বের আধারশিলা।

 বিশের দশকে বাখতিন ‘নান্দনিক প্রক্রিয়ায় লেখক ও নায়ক’ বিষয়ে যে-রচনাটি লেখেন, আদি পর্যায়ের সেই লেখার প্রচ্ছায়া পরবর্তী পর্যায়েও অনুভব করা যায়। নন্দনচিন্তার সঙ্গে জ্ঞানতত্ত্ব ও নীতিতত্ত্বকে তখন তিনি সমন্বিত করতে চেয়েছেন। পরিণত পর্যায়ে তিনি যে জানালেন, ‘কোনো তাৎপর্য পুরোপুরি হারিয়ে যায় না কখনো’—সেই সূত্র অনুযায়ী আদিরচনায় ব্যক্ত বেশ কিছু ভাববীজ এবং জিজ্ঞাসা তিনি পরবর্তী কালে পুনরুত্থাপন করেছিলেন। তরুণ বয়সেও তাঁর মনে এই বোধোদয় হয়েছিল যে জীবনের বৃত্তকে ভেতর থেকে দেখলে কখনো সম্পূর্ণ মনে হয় না। নিজেদের জন্ম এবং মৃত্যু পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতা আমরা অর্জন করি না কখনো; কেবলমাত্র অপর কোনো ব্যক্তির জীবনবৃত্ত আমাদের চোখে সম্পূর্ণ হতে পারে। এইজন্যে আমরা কিছুতেই নিজেদের জীবনকথার নায়ক হতে পারি না। নায়কোচিত সম্পূর্ণতার প্রাক্‌শর্ত এই যে, অন্য কেউ তাকে পর্যবেক্ষণ করবে, বাইরে দাঁড়িয়ে। সেই অপর সত্তার অবস্থান নায়কের জীবনবৃত্তের মধ্যে হবে না কখনো। বাখতিনের আকল্প অনুযায়ী প্রতিটি তাৎপর্য সমাজের দ্বারা নির্মিত ও নির্ধারিত, অতএব স্বয়ং বাখতিনও তখন ঐতিহাসিক ভাবে নিয়ন্ত্রিত এবং নির্দিষ্ট সামাজিক ও রাজনৈতিক আয়তনের মধ্যে থেকে প্রস্তাবিত নতুন জীবনস্বপ্ন ও সামূহিক পুনর্গঠনের প্রস্তাবনাকে সঠিক তাৎপর্য বুঝতে চাইছিলেন। সম্ভবত এইজন্যে তাঁকে উপযুক্ত তাত্ত্বিক আকরণ খুঁজে নিতে হলো। এতে এই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে নির্দিষ্ট সামাজিক ও রাজনৈতিক বর্গায়তনের ভেতরে থেকে যদি সম্পূর্ণ তাৎপর্য বোঝা না যায়—অন্তত সম্ভাবনায় যেতে হবে তার বাইরে। কিন্তু এর মানে কি এই যে বাখতিন সমাজতান্ত্রিক আকরণকে অস্বীকার করতে চাইছিলেন? না, একথা বলা যায় না। অতি সরলীকৃত এই ব্যাখ্যা পুঁজিবাদী বিশ্বের কাছে খুবই গ্রাহ্য হলেও সম্ভাব্য সহজ বিশ্লেষণটি এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। বাখতিন আসলে ঈপ্সিত তাৎপর্যে পৌঁছানোর জন্যে প্রেক্ষণবিন্দুর পরীক্ষা করে দেখছিলেন। সমাজতান্ত্রিক অণুবিশ্বের প্রতি প্রচ্ছন্ন কোনো প্রত্যাখ্যান তাঁর বক্তব্যে বিম্বিত হয়নি। সত্যকে আমার নির্মাণ করি নিশ্চয়; কিন্তু তা করি দ্বিবাচনিকতার মধ্য দিয়ে। এই মহাসূত্রে অবশ্য বাখতিন পৌঁছেছেন আরো কিছুকাল পরে। আপাতত তিনি লক্ষ করছিলেন, ইতিহাস-নির্দেশিত মুহূর্ত ও পরিসর সত্যের উদ্ভাসনের জন্যে অপর মুহূর্ত ও পরিসরের দর্পণের ওপর নির্ভরশীল। কী ব্যক্তিজীবনে কী সামূহিক জীবনে—এই আকল্পের প্রায়োগিক উপযোগিতা অসামান্য।

৭২